সব
২০১৮ সালের ২ এপ্রিল প্রাচীন ময়মনসিংহ পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়। পরবর্তিতে একই বছরের ১৪ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (সিটি কর্পোরেশন শাখা-২) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে (এস, আর, ও নং ৩০১-আইন/২০১৮)। সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে বয়ড়া ও আকুয়া ইউনিয়ন সম্পূর্ণ এবং খাগডহর, চর ঈশ্বরদিয়া, দাপুনিয়া, ভাবখালী, সিরতা ও চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের আংশিক এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন ১২টি ওয়ার্ড ও ময়মনসিংহ পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে সর্বমোট ৯১.৩১৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এলাকা নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে পৌরসভার কার্যক্রম বিলুপ্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য, ক শ্রেণীর ময়মনসিংহ পৌরসভার আয়তন ছিল ২১.৭৩ বর্গ কিলোমিটার।
সদর উপজেলার গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন এলাকা সিটি কর্পোরেশনের নতুন ১২টি ওয়ার্ডে অন্তর্ভূক্ত হয়ে নতুন পরিচিতি লাভ করে। ২২ নং ওয়ার্ডে বয়ড়া ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ ওয়ার্ডের সর্ম্পূণ অংশ; ২৩ নং ওয়ার্ডে সুতিয়াখালী ও বেলতলী; ২৪ নং ওয়ার্ডে বয়ড়া ইউনিয়নের ৭ ও ৯ ওয়ার্ড এবং ছভাগিয়া ও ছালাকান্দি; ২৫ নং ওয়ার্ডে দিঘারকান্দা ও ফকিরাকান্দা; ২৬ নং ওয়ার্ডে উজান বাড়েরা (আকুয়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের অংশ), কান্দাপাড়া, মধ্যবাড়েরা, ভাটিবাড়েরা ও শিকারীকান্দা; ২৭ নং ওয়ার্ডে আকুয়া দক্ষিণপাড়া (আকুয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের অংশ)ও মোড়লপাড়া; ২৮ নং ওয়ার্ডে চুকাইতলা, আকুয়া দক্ষিণপাড়া (আকুয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের অংশ); ২৯ নং ওয়ার্ডে উত্তর দাপুনিয়া (দাপুনিয়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের অংশ), কলাপাড়া (দাপুনিয়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের অংশ), হাড় গুজিরপাড়, দাপুনিয়া ভাটিপাড়া (পশ্চিম) (দাপুনিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের অংশ), বাদেকল্পা (নাজমি), বাদেকল্পা (রুস্তম), উজান বাড়েরা (আকুয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের অংশ) ও গন্দ্রপা; ৩০ নং ওয়ার্ডে খাগডহর (খাগডহর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের অংশ), কিসমত, হাসিবাসী, বৈশাখাই, বাঘেরকান্দা, নিজকল্পা, রহমতপুর (খাগডহর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের অংশ); ৩১ নং ওয়ার্ডে জেলখানার চর (খাগডহর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের অংশ), চর ঈশ্বরদিয়া ও চর গোবিন্দপুর; ৩২ নং ওয়ার্ডে চায়নামোড়-চরকালিবাড়ি এবং ৩৩ নং ওয়ার্ডে চর ঝাউগড়া, চর গোবদিয়া, শম্ভুগঞ্জ বাজার ও রঘুরামপুর (সূত্র: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন শাখা-২ প্রজ্ঞাপন নং ৪৬..০০.০০০.০৭১.
২২.০০৫.১৩(অংশ-২)-৩৩ তারিখ ২০ জানুয়ারি ২০১৯)।
গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন এলাকা নতুন ১২টি ওয়ার্ডে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক হোল্ডিং নম্বর প্রদানপূর্বক সিটিকর নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেমতে এসব এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাগণ হোল্ডিং করসহ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি বাবদ সিটিকর প্রদান করছেন। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৮ অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের স্থায়ী কার্যাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো:
*রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার।
*ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন।
*রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তায় লাইট বা বাতি লাগানোর ব্যবস্থা।
*নিয়মিত গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ ও নিষ্কাশন।
*মশার উপদ্রব কমাতে ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো ও লার্ভিসাইডিং।
* নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কম খরচে চিকিৎসা সেবা প্রদান।
*বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা বিতরণ কার্যক্রম।
*মা ও শিশু সহায়তা ভাতা এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা।
*অন্যান্য নানাবিধ কার্যক্রম।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের বয়স ইতোমধ্যে ৮ বছর হয়েছে। গ্রামীণ জনপদের প্রান্তিক ১২টি ওয়ার্ডের জনগণ সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক পরিচয় লাভ করে এই ৮ বছরে কতটুকু নাগরিক সেবা- সুবিধা পেয়েছেন তা আজ পর্যালোচনার দাবী রাখে। সিটির সন্তোষজনক মানদন্ডে উন্নীত হতে পেরেছে কি? নাকি শুধু সিটির বাসিন্দা হিসেবে মানসিক তৃপ্তি পেয়েছে? বাস্তবচিত্র কি বলে?
সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম একটি কাজ হলো রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার। ইউনিয়নের গ্রামীণ জনপদের সিটিভূক্ত নাগরিকগণ আশায় বুক বেঁধেছিলেন, এলাকার কাঁচা রাস্তা পাকা হবে। ভাঙ্গা রাস্তা মেরামত হবে। প্রাত্যহিক চলাচল সহজ হবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মূখ দেখবে। সিটির ৮ বছরে এই সুবিধা প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহের নাগরিকগণ কতভাগ পেয়েছেন? তাদের আশা কি আশারুপ পূরণ হয়েছে?
ড্রেনেজ ব্যবস্থা একটি গুরুত্ব বিষয় সিটি কর্পোরেশন এলাকায়। গত ০৮ বছরে ময়মনসিংহ সিটির প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা কতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে। প্রান্তিক ওয়ার্ডগুলোর বিভিন্ন এলাকায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। কোথাও কোথাও ড্রেন হলেও অপরিকল্পিত চিত্র দৃশ্যমান। মাঝখানে বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে ড্রেন করা হয়েছে। আবার কোথাও পানি সামনে দিকে না যেয়ে উল্টোদিকে পেছনে আসে। কারণ সামনে দিকে ড্রেন উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে।
সিটি এলাকায় রাতের নিরাপত্তা ও চলাচল নিশ্চিত করতে প্রতিটি রাস্তায় লাইট বা বাতি লাগানো এবং তা প্রজ্জ্বলন নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রান্তিক ১২টি ওয়ার্ডের প্রতিটি রাস্তায় পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বাতি আছে কি? নাগরিকরা কি গত ৮ বছরে সে সুবিধা নিশ্চিতভাবে পাচ্ছেন? আজও প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহের অনেক রাস্তায় বৈদ্যুতিক খুঁটি নেই। বাতি তেো পরের ধাপ। উদাহরণস্বরুপ, এই নিবন্ধের লেখক নিজেও একটি প্রান্তিক ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। সেই ওয়ার্ডের ঘনবসতিপূর্ণ একটি রাস্তায় মানদন্ডসম্পন্ন বৈদ্যুতিক খূঁটি নেই। বাসিন্দারা প্রয়োজনের তাগিদে নিজেরা সিমেন্টের পিলার তৈরি করে স্থাপন করেছেন।
ইউনিয়ন আমলে স্থাপিত অপর একটি ছোট্ট পিলার রয়েছে, যা থেকে অসংখ্য পরিবার সংযোগ নিয়েছে। এমন চিত্র অনেক প্রান্তিক ওয়ার্ডেই খোঁজে পাওয়া যাবে।
নিয়মিত গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ ও নিষ্কাশন করে সিটি এলাকা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ময়মনসিংহ সিটির প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহের নাগরিকগণ কি এই সুবিধা পাচ্ছেন? গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ ও অপসারন চিত্র কেবল সাবেক পৌরসভার ওয়ার্ডগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ। প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহের নাগরিকগণ এই সুবিধা কবে পাবেন তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। গত ৮ বছরে প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহে নির্দিষ্ট স্থানে গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য ডাস্টবিন স্থাপিত হয়েছে কি বা স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে কি? অনেক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রয়েছে যেখানে যত্রতত্র গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
মশার উপদ্রব কমাতে মশাবাহিত রোগ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে ওষুধ ছিটানো সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত কাজের একটি। মশার উপদ্রব কি শুধু সাবেক পৌর ওয়ার্ডসমূহে আছে, প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহে কি নেই? প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহের নাগরিকগণকে কি মশা কামড়ায় না? এসব প্রশ্ন এখন প্রান্তিক ওয়ার্ডের নাগরিকদের মনে। কারণ, মশক নিধন কার্যক্রম যেন সাবেক পৌরসভার ওয়ার্ডসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহে মশকনিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। অথচ সকল ওয়ার্ডেই দৃশ্যমান থাকার কথা।
নিয়মিতভাবে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কম খরচে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সিটি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এতে সাধারণ স্বল্প আয়ের নাগরিকগণ স্বল্প খরচে স্বাস্থ্যসেবা পান। কিন্তু বাস্তবচিত্র কি? প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আছে কি? স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না থাকলে নাগরিকগণ স্বল্প খরচে নিয়মিতভাবে প্রতিদিন স্বাস্থসেবা পাবেন কি করে? বাস্তবে দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশনের ডাক্তার প্রান্তিক ওয়ার্ডে অনিয়মতভাবে মাঝেমাঝে যান। গিয়ে কারোর বাড়ীতে বা কারোর প্রতিষ্ঠানে বসেন, যা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়। এই হলো প্রান্তিক ওয়ার্ডে স্বাস্থসেবা প্রদানের চিত্র। এভাবে কি যথাযথভাবে স্বাস্থসেবা প্রদান করা সম্ভব? চিকিৎসাজনিত স্বাস্থসেবা তো প্রাত্যহিক বিষয়, অনিয়মিত কোন বিষয় নয়।
আলোচ্য নিবন্ধে মোটাদাগে প্রান্তিক ১২টি ওয়ার্ডের নাগরিকদের সেবা-সুবিধা প্রাপ্তি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত কয়েকটি খাত আলোকপাত করা হয়েছে মাত্র। কারণ, সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার গত ০৮ বছরে সেসব ওয়ার্ডের নাগরিকগণ কতটুকু সেবা-সুবিধা পেয়েছেন বা ভোগ করছেন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম কতটুকু হয়েছে তা পর্যালোচনা করা উচিত। যেসব গ্রামীণ জনপদ নিয়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন গঠিত হয়েছে সেসব জনপদের নাগরিকগণ নির্দিষ্ট মানদন্ডের সেবা-সুবিধা ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকবেন কেন? গ্রামীণ জনপদের নাগরিকগণ সিটির অধীনে এসে সিটি কর প্রদান করছেন বছরের পর বছর সেবা-সুবিধা প্রাপ্তি ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য নয়। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের অধিকাংশ কার্যক্রম সাবেক পৌরসভার সীমানার মাঝে আটকে থাকবে কেন? যথাযথ সেবা-সুবিধা প্রদান ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক ওয়ার্ডসমূহকে একটি সন্তোষজনক মানদন্ডে আনা জরুরি। আর সে দায়িত্বটি প্রধানত: সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকেই পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রান্তিক ১২টি ওয়ার্ডের গ্রামীণ জনপদ অন্তর্ভূক্ত করেই সাবেক ময়মনসিংহ পৌরসভা আজ ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন।
লেখক: সমন্বয়কারী, ময়মনসিংহ মঞ্চ।
মন্তব্য