সব
বাংলার মাটি মরমী সাধকদের পুন্যভূমি। যুগ যুগ ধরে বাংলার মাটিতে আগমন ঘটেছে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত মরমী সাধকদের। তাঁরা তাঁদের গানের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন সৃষ্টির কথা, সৃষ্টিতত্ত্বের কথা, মানবতার কথা, সহমর্মিতার কথা, সহনশীলতার কথা, সম্প্রীতির কথা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা, বিরহ-বিচ্ছেদের কথা। তেমনি একজন মরমী সাধক ভাটি-বাংলার উকিল মুন্সী (১১ জুন ১৮৮৫-১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮)। যিনি তাঁর গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন এসব বিষয় সুরে সুরে সাবলীলভাবে।
উকিল মুন্সীর নামটি শুনলেই আমাদের কানে বাঁজে তাঁর বিরহী আবেগীময় গানের কথা। যেমন, আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে, আমার গায়ে যত দু:খ সয়, সোয়াচান পাখি ইত্যাদি। আবার অনেক মিষ্টি প্রেমের বিখ্যাত গানও তাঁর হাত ধরে বাংলার লোকসঙ্গীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন, আমার কাংখের কলসী।
উকিল মুন্সী নামটি কি এই মরমী সাধকের পারিবারিক নাম? তা কিন্তু নয়। পাৱিবাৱিক নাম আব্দুল হক আকন্দ, ডাক নাম উকিল। তাহলে উকিলের সাথে মুন্সী যোগ হলো কিভাবে? একসময় পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম। ইমামতি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি মক্তবে ছেলে-মেয়েদের আরবী ফার্সিও পড়াতেন। ইমামতি পেশায় থেকে তিনি গানের জগতের ভাবতরঙ্গে বিচরণ করেছেন। রচনা করেছেন কালজ্বয়ী যত গান। গানের জনপ্রিয়তায় ইমামতি পেশা থেকে মুন্সী শব্দটি তার ডাক নামের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। উকিল মুন্সী নামেই সমধিক পৱিচিতি লাভ কৱেন। হারিয়ে যায় তার আসল নাম আব্দুল হক নামটি।
ইমাম মরমী সাধক উকিল মুন্সীর অবয়ব তবে কেমন ছিল? তিনি মারা গিয়েছেন ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বরে বার্ধ্যজনিত কারণে। মৃত্যকালে তাঁর বয়স ছিল ৯৩ বৎসর।তখনকার সময়ের আলোকে তাঁর কি কোন মূল ছবি আছে? প্রমাণযোগ্য কোন মূল ছবি অনুসন্ধানী ব্যক্তি বা কোন গবেষক পাননি। পরিবার-পরিজনদের কাছেও নেই। পেশা, গান, জীবনাচার, বয়স ইত্যাদি বিষয়কে ভিত্তি করে অনেকে তাঁকে আঁকতে চেষ্টা করেছেন। এজন্য বিভিন্ন অবয়বের ছবি আমরা দেখতে পাই। যার কোনটাই তেমন স্বীকৃত নয়।
গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখ ছিল মরমী সাধক উকিল মুন্সী ১৪১ তম জন্মবার্ষিকী। এদিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রদর্শিত হয় উকিল মুন্সীর জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘একতারার ইমাম’। ইমাম আবার একতারার হন কি করে? হবেন না কেন ইমাম যদি মরমী সাধক হন। উকিল মুন্সী যে ছিলেন মরমী সাধক। তাই তো তিনি একতারার ইমাম।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রযোজিত প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘সিনেহাট’ ও ‘মোশন বাংলা’। প্রামাণ্যচিত্রটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অনার্য মুর্শিদ। চিত্রগ্রহণ করেছেন পিকলু নীল, প্রভাত আহমেদ এবং জন উইলিয়াম। আবহসংগীত ও শব্দ পরিচালনায় ছিলেন রবিউল ইসলাম শশী এবং সম্পাদনা ও রঙবিন্যাস করেছেন লায়লা ফেরদৌসী।
প্রামাণ্যচিত্রটির একটি বিশেষ দিক হলো এর পোস্টার। পোস্টারে মরমী সাধক উকিল মুন্সীর একটি স্কেচ রয়েছে। স্কেচটি এঁকেছেন তরুন চিত্রশিল্পী এ জেড শিমুল। চিত্রশিল্পী শিমুল উকিল মুন্সীর বংশধর, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় জৈষ্ঠ বাসিন্দাদের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা, যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের বর্ণনার আলোকে পোস্টারে বর্ণিত স্কেচটি এঁকেছেন। তিনি বলেন, স্কেচ আঁকার পর্বট শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগে। মাঝপথে কিছুটা সময় বিরতি গেলেও তাকে যখন পুনরায় আঁকতে বলা হলো তখন তিনি আত্মীয়-স্বজন ও লোকমূখে শুনে শুনে আঁকার চেষ্টা করেছেন। অনেকগুলো ড্রয়িং স্কেচ করার পরে উকিল মুন্সি নাতির পারুল মিয়া পোস্টারে দৃশ্যমান স্কেচটির প্রতি সম্মতি দেওয়ার পর পোস্টারের জন্য নির্বাচন করা হয়। তারপরে তিনি ক্যানভাসে রঙে আঁকেন। স্কেচের সাথে অনেকটাই মিল রয়েছে বলে পারুল মিয়া জানান। এদিকে চিত্রশিল্পী শিমুল সুফি ভাবাদর্শের পরিবারে বেড়ে উঠায় উকিল মুন্সীর স্কেচ অঙ্কনে তারও প্রভাব রয়েছে।
একজন মরমী সাধকের অবয়ব বা স্কেচ তেমন মূখ্য নয়, মূখ্য তার ভাবাদর্শন। সঙ্গীতের মাধ্যমে তারা যে ভাবাদর্শন রেখে যান তা আত্মস্থ করাই মূখ্য। তবুও কোন মরমী সাধকের গ্রহণ ও প্রমাণযোগ্য অবয়ব বা স্কেচ দৃশ্যমান থাকলে ও প্রচারিত হলে তা মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করার সক্ষমতা রাখে। তাই একজন মরমী সাধকের নির্দিষ্ট অবয়ব দৃশ্যমান রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বৈকি। একতারার ইমাম প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশ শিল্পকলার অর্থায়নে নির্মিত। তাই এই প্রামাণ্যচিত্রের স্বত্বাধিকারীও শিল্পকলাই। প্রামাণ্যচিত্রের পোস্টারটি তারা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যদি প্রামাণ্যচিত্রটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি সমূহের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রদর্শনী ব্যবস্থা করে তাহলে মরমী সাধক উকিল মুন্সীর ভাবাদর্শন প্রজন্মের সামনে উঠে আসবে। পাশাপাশি প্রদর্শনীর ফলে পোস্টারে দৃশ্যমান উকিল মুন্সীর স্কেচটিও প্রজন্মের সামনে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। যেহেতু শিল্পকলা একাডেমি একটি রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
সংস্কৃতি বা সংগীত ও ধর্মীয় চর্চা নিয়ে সমাজে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মাঝে দ্বন্দ্ব রয়েছে যুগ যুগ ধরে। প্রকৃত অর্থে যে কোন দ্বন্দ্ব নেই তার প্রমাণ মরমী সাধক উকিল মুন্সী। তিনি ইমামতিও করেছেন আবার গানের মাধ্যমে ভাববাদের ভাবতরঙ্গে ডুবে থাকার চেষ্টাও করেছেন। গানে গানে সৃষ্টিকর্তার কথা বলেছেন, সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বলেছেন, সহমর্মিতা সহাবস্থানের কথা বরেছেন। পাশাপাশি মানবজীবনের দু:খ-কষ্ট, বিরহের কথাও বলেছেন। তাই বলা যায়, ‘একতারার ইমাম’ প্রামাণ্যচিত্রটি বাস্তবতার আলোকে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তর প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ, সভাপতি, সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ, ময়মনসিংহ।
মন্তব্য