সব
ছবি, সংগৃহীত
দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আয়ের গতিধারা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ কমানোর কৌশল হিসেবে এবার ভিন্নধর্মী এক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একবারে পুরো বেতন-ভাতা বৃদ্ধি না করে, তিন ধাপে এই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক) সমন্বয় করা হবে এবং তৃতীয় বছরে গিয়ে আবাসন, চিকিৎসাসহ সব ধরনের ভাতা কার্যকর করা হবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথম বছরের আর্থিক হিসাব সামাল দিতে আগামী বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েই এই বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, পে-স্কেল পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে এই তিন ধাপের বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কমিটির তৈরি করা এই চূড়ান্ত সুপারিশমালা অতি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। সরকারপ্রধানের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরপরই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, যা দেশের ইতিহাসে সরকারি বেতন কাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। কমিটি বিভিন্ন অংশীজন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দেওয়া মতামত এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেই এই মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে।
বাস্তবায়ন কৌশল ও সময়সূচি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই এই নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের বিদ্যমান কাঠামোর মূল বেতনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ সমন্বিত অর্থ পাবেন। এর ঠিক পরবর্তী অর্থবছরে অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপে, মূল বেতনের বাকি অংশটুকুও একইভাবে সমন্বয় করা হবে। ফলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কর্মচারীদের মূল বেতন সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উন্নীত হবে। তবে এই দুই বছর কর্মচারীরা আগের নিয়মেই বাড়িভাড়া বা অন্যান্য ভাতা পেতে থাকবেন, নতুন হারের ভাতা এই সময়ে যুক্ত হবে না।
কমিটির সুপারিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কার্যকারিতা। আবাসন সংকট, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, যাতায়াত খরচ ও মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি বিবেচনায় ভাতা বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের হলেও, তা একযোগে কার্যকর করা হচ্ছে না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিশেষ প্রণোদনা ও ঝুঁকি ভাতাসহ সব ধরনের আর্থিক সুবিধা তৃতীয় বছর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, একবারে বেতন ও ভাতা দুটিই বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে দিলে বাজারে হঠাৎ করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, পাশাপাশি সরকারের কোষাগারের ওপরও এককালীন বড় ধাক্কা আসে। এই দ্বিমুখী সংকট এড়াতেই এই ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল।
এই নতুন বেতন কাঠামোর পরিধি ও আওতা হবে অত্যন্ত ব্যাপক। এটি কেবল সচিবালয় বা নির্দিষ্ট কোনো ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, পুলিশ বাহিনী, স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসনের কর্মচারী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ রাষ্ট্রের সব স্তরের স্থায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এর সুফল পাবেন। একই সঙ্গে দেশের স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশন ও প্রতিষ্ঠানের জনবলের জন্যও এই পে-স্কেলের আলোকে নিজস্ব গভর্নিং বডির মাধ্যমে সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হবে।
এবারের পে-স্কেলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের প্রতি বিশেষ নজরদারি। কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা। তাই উচ্চ গ্রেডগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির অনুপাত বা হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি চাকুরির বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্যও এই নতুন পে-স্কেলে বড় ধরনের সুসংবাদ থাকছে। সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের সুপারিশের সূত্র ধরে পেনশনধারীদের পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশনের পরিমাণ প্রায় ১০০ শতাংশ বা দ্বিগুণ করার সুপারিশ রয়েছে। এছাড়া ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান এমন প্রবীণদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে, যা বর্তমানে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সরকারের এই তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশলকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক নীতিনির্ধারকেরা। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, বিগত কয়েক বছরে দেশের মূল্যস্ফীতির যে পারদ, তার তুলনায় সাধারণ কর্মচারীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট খুবই সামান্য ছিল, যার ফলে তাদের প্রকৃত আয় কমে গিয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সরকারের ওপর রাজস্ব আদায়ের বড় চাপ রয়েছে। এই বাস্তবতায় একবারে পুরো সুবিধা দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের নেই। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োচিত।
মন্তব্য