সব
জনআকাঙ্খার বাংলাদেশ পুলিশ: রাজনৈতিক আঙ্গীকার ২০২৬-২০৭৫ ও আগামীর ‘স্মার্ট পুলিশিং’ রূপরেখা
সূচনা: ঐতিহ্যের দর্পণে আমাদের পুলিশ
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অসিন্তত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তার অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাস কেবল অপরাধ দমনের ইতিহাস নয়, বরং এটি আত্মত্মত্যাগ এবং বিবর্তনের এক জীবন্ত উপাখ্যান। ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দমনমূল মানসিকতা নিয়ে যে পুলিশ কাঠামোর পত্তন হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজারবাগ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে সেই বাহিনী লাভ করে তার নতুন পরিচয়-জনগণের পুলিশ। কিন্তু অর্ধ-শতাব্দী পার হওয়ার পরেও আমাদের পুলিশিং ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক আইনের ছাপ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব রয়ে গেছে। আজ সময় এসেছে সেই সনাতন কাঠামো ভেঙে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী গড়ে তোলার।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জন- আকাঙ্খার বিবর্তন:
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বারবার বুকের রক্ত দিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ রাষ্ট্রের দাবি জানিয়েছে। এই দাবির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল পুলিশি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন:
১)১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল মন্ত্র ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। স্বাধীনতার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল পুলিশ হবে নিপীড়ক শক্তির বদলে শোষিত মানুষের পরম বন্ধু।
২)১৯৯০ এর গণ-আন্দোলন: স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনের সময় জন-আকাঙ্খা ছিল একটি নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী, যারা কোনো বিশেষ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করে সংবিধানের রক্ষক হিসেব কাজ করবে।
৩)২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব: চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাউত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পুলিশ যখন জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। চব্বিশের আকাঙ্খা হলো পুলিশ হবে ভয়মুক্ত দুর্নীতিমুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন পেশাদার সংস্থা।
ঐতিহাসিক বাংলাদেশ পুলিশ দীর্ঘকাল শাসনগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার উত্তরাধিকার বহন করছে। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন মূলত তৈরি হয়েছিল প্রজাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, সেবা দেওয়ার জন্য নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমূল পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পুলিশের কাজ কেবল ভয় দেখানো নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধের ধরন পাল্টেচ্ছে: সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি এবং আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রচলিত আইন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখন সমেয়ের দাবি।
প্রশাসনিক সংস্কার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনা
প্রাথমিক সোপান:ভিত্তি স্থাপন ও আইনি সংস্কার (২০২৬-২০৩০)
এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হলো পুরনো ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙে নতুন আইন ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করা।
১)নতুন পুলিশ আইন (New Police Act): ১৮৬১ সালের আইন বাতিল করে জন-আকাঙ্খা ও মানবাধিকার ভিত্তিক নতুন আইন প্রণয়ন।
২)সেবা বলবৎকারি পুলিশ (Service Enforcement Police (SEP)) গঠন: একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে কয়েকটি জেলায় মাদক,পরিবেশ ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় পুলিশের অধীনে ‘সমন্বিত এনফোর্সমেন্ট শুরু করা।
৩)প্রাতিষ্ঠানিক স্বধীনতা:পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন।
৪)ডিজিটাল থানা: প্রতিটি থানায় পেপারলেস কার্যক্রম এবং অনলাইন জিডি/অভিযোগ ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করা
নতুন পুলিশ আইন (New Police Act)১৮৬১- এর শৃঙ্খলা ভেঙে ২০৭৫ এর লক্ষ্যে একটি স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশনের অনিবার্য অগ্রযাত্রা:
১৮৬১ সাল এবং ২০৭৫ সাল- সময়রেখা দুই প্রাপ্তে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন দর্শন। একটির জন্ম হয়েছিল পরাধীন ভূখন্ডে শাসককে সুরক্ষা দিতে, আর অন্যটির প্রয়োজন একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ১৬৫ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক আইন কাঠামো দিয়ে একুশ শতকের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সমাজ চালানো কেবল অসম্ভবই নয়, বরং বিপজ্জনক। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় পরীক্ষা হলো আমরা কি পুলিশকে রাজনীতির ‘অস্ত্র’ হিসেবে রেখে দেব, নাকি তাকে আইনের ‘সেবক’ হিসেবে মুক্তি দেব?
১. কেন জাতীয় পুলিশ কমিশন একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী একটি অদৃশ্য বৃত্তে বন্দি ছিল। নিয়োগ থেকে শুরু করে বদলি- প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব বাহিনীর পেশাদারিত্বকে গ্রাস করেছে। যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তার পদোন্নতি মেধার বদলে আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে, তখন তিনি আইনের চেয়ে ক্ষমতার প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। একটি স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশন কোনো বিলাসিতা নয়: এটি সেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল’ যা পুলিশকে রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষা দেবে। এটি গঠন করা মানে সরকারকে দূর্বল করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপহার দেওয়া।
প্রস্তাবিত ‘পুলিশ আইন বিশেষজ্ঞ কমিটি’ কেমন হতে পারে:
একটি যুপোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন ও বহুমাত্রিক কমিটি গঠন করা আবশ্যক। এই কমিটির গঠন হতে পারে সদস্যবৃন্দ: সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকা কর্মী, আন্তর্জাতিক আইন বিশেজ্ঞ, অভিজ্ঞ অপারেশনাল পুলিশ কর্মকর্তা, সমাজবিজ্ঞানী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি নিয়ে।
বিশেষজ্ঞ কমিটি যেসব বিষয়ে আলোপাত করবে (TOR)
কমিটির মূল কাজ হবে একটি” সেবা কেন্দ্রিক” (Service-centric) আইনি কাঠামো তৈরি করা। তাদের পর্যালোচনার মূল বিষয়গুলো হবে:
১. পুলিশের ভূমিকার সংজ্ঞায়ন: পুলিশ কেবল লাঠি বা বন্দুকধারী বাহিনী নয়; বরং তারা সামাজিক সুরক্ষার অংশ। আইনে পরিষ্কার করতে হবে যে, পুলিশের প্রাথমিক কাজ নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।
২. ইউনিটভিত্তিক বিশেষায়ন ও সমন্বয়: ভবিষ্যতের জটিলতা সামলাতে পুলিশকে বিভিন্ন ইউনিট যেমন সেবা
বলবৎকারী পুলিশ (Sevice Enforcement Police-SEP), সাইবার ক্রাইম ইউনিট, ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ইত্যাদি বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আইনের (যেমন: পরিবেশ বা পর্যটন বা রেলওয়ে) সাথে পুলিশের অপারেশনাল ক্ষমতার সমন্বয় কীভাবে হবে, তার স্পস্ট রূপরেখা তৈরি করা। আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে একটি বিশেষায়িত ইউনিটে রূপান্তর ও র্যাবে নতুন পদায়নের মাধ্যমে একটি নির্মোহ পুলিশ ইউনিটে রূপান্তর করা।
৩. প্রযুক্তি ও তথ্য সুরক্ষা: ২০৭৫ সালের পুলিশিং হবে ডেটা-নির্ভর। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Data Privacy) রক্ষা করে কীভাবে ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন চালানো হবে, তার আইনি রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা।
৪. স্বাধীন জবাবদিহি কাঠামো: পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ‘Independent Police Authority গঠন। কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছাড়াই যেন পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারে, তার নিশ্চয়তা দেওয়া।
৫. নিয়োগ ও সক্ষমতা উন্নয়ন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা। পদোন্নতি হবে কেবল মেধা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে।
৬. আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন: জরুরী মুহুর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং আধুনিক প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য পুলিশকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা।
পরিশেষে বলা যায়, নতুন পুলিশ আইন মানে কেবল পুরনো ধারা পরিবর্তন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের দর্শনগত পরিবর্তন। আমরা যদি ২০৭৫ সালের একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই, তবে পুলিশকে “শাসকের রক্ষক” থেকে ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। ২০২৬ সালের নতুন পুলিশ আইন হবে সেই রূপান্তরের প্রথম সোপান। সরকারের উচিত অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সংস্কারের সূচনা করা।
২. ২০৭৫ সালের চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে আমাদের পুলিশ কি প্রস্তুত?
আগামী ৫০ বছরে অপরাধের ভূগোল বদলে যাবে। ২০৭৫ সালের পুলিশিং হবে ডেটা-নির্ভর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এবং মনস্তাত্ত্বিক। তখন অপরাধ কেবল রাজপথে হবে না, হবে ক্লউড সার্ভারে মেটাভার্সে কিংবা পরিবেশ ধ্বংসকারি কর্পোরেট সিন্ডিকেটে।
প্রযুক্তি বনাম মানবিকতা: ২০৭৫ সালে যখন ড্রোন ও এআই দিয়ে নজরদারি হবে, তখন নাগরিকের ‘প্রাইভেসি’ রক্ষার জন্য কঠোর আইনি কাঠামো লাগবে।
বিশেষায়িত ইউনিট: সাইবার যুদ্ধ বা তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare) মোবাবিলায় সাধারণ কনস্টেবলারি দিয়ে কাজ হবে না: প্রয়োজন হবে ‘সার্ভিস এনফোর্সমেন্ট সাইবার পুলিশ’-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিট।
এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন তা কোন রাজনৈতিক সরকারের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সম্ভব নয়। এজন্যই একটি স্থায়ী ও বিশেষজ্ঞ-নির্ভর পুলিশ কমিশন অপরিহার্য। কিন্তু ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশ যখন আমরা ২০৭৫ সালের একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছি, তখন সেই ঔপনিবেশিক দর্শনের কোনো স্থান থাকতে পারে না। একটি স্বাধীন ও আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো, যা তিনটি মৌলিক স্তান্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
১. অপারেশনাল স্বায়ত্তশাসন: রাজনীতির ছায়া থেকে মুক্ত
আমাদের পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতিতে অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। যখনই মেধার চেয়ে আনুগত্য প্রধান্য পায়, তখনই পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ধসে পড়ে। ২০২৬ সালের নতুন আইনে পুলিশের অপারেশনাল স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এর মূল লক্ষ্য হবে নিয়োগ ও বদলীর পুপো প্রক্রিয়াকে একটি মেধাভিত্তিক তদারকি কাঠামোর অধীনে আনা। একজন যোগ্য কর্মকর্তার পদোন্নতি বা বদলি যেন কোনো রাজনৈতিক নেতার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে, বরংতার দক্ষতা ও সততার ওপর ভিত্তি করে হয়-আগইনগতভাবে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একমাত্র তবেই পুলিশ ‘শাসকের লাঠিয়াল’ হওয়ার গ্লানি থেকে মুক্তি পাবে।
২. নাগরিক জবাবদিহি: আস্থার নতুন সেতু
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব দীর্ঘদিনের। এই দূরত্ব ঘোচানোর একমাত্র পথ হলো কার্যকর নাগরিক জবাবদিহি। বর্তমান ব্যবস্থায় পুলিশের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত প্রায়শই বাহিনীর ভেতর থেকেই করা হয়, যা স্বচ্ছতার অভাব তৈরি করে। প্রস্তাবিত আইনে একটি স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ (Independent Police Complaint Authority -IPCA) গঠন করা জরুরী। এর ফলে সাধারণ মানুষ পুলিশের ক্ষমতার অপব্যহার বিনা কারণে হয়রানি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য একটি নিরপেক্ষ জায়গা পাবে। যখন পুলিশ জানবে যে তাদের প্রতিটি কাজের জন্য একটি স্বাধীন সংস্থার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন ক্ষমতার দম্ভের বদলে সেবার মানসিকতা তৈরি হবে। এটি কেবল জনগণের অধিকার রক্ষা করবে না, ররং পুলিশের ভেতরের স্বচ্ছ কর্মকর্তাদেরও সুরক্ষা দেবে।
৩. ভবিষ্যৎমূখী নীতি: ২০৭৫ সালের প্রস্তুতি
আজ থেকে ৫০ বছর পর অপরাধের বর্তমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। ২০৭৫ সালের অপরাধ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন ভবিষ্যৎমূখী নীতি। প্রযুক্তি তখন আশীর্বাদের পাশাপাশি অভিশাপও হয়ে উঠতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত অপরাধ, সাইবার যুদ্ধ, কিংবা পরিবেশ ধ্বংসকারী সূক্ষ কারসাজি মোকাবিলার জন্য আজকের পুলিশিং ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
পেশাদারিত্বের এই আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন:
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: অপরাধ শনাক্ত ও তদন্তে ডিজিটাল ফরেনসিক এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সর আইনি প্রয়োগ।
মানবাধিকারের নতুন মানদনড: নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা (Data Privacy) এবং ব্যক্তিগত গোপনীতা রক্ষা করে কীভাবে স্মার্ট পুলিশ করা যায়, তার আধুনিক রূপরেখা।
বিশেয়ায়িত সক্ষমতা: মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত অপরাধ দমনে দক্ষ একটি বাহিনী গঠন।
রাষ্ট্রের সদিচ্ছার পরীক্ষা
এই তিনটি স্তম্ভ-স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহি এবং আধুনিকায়ন বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষা। এটি কেবল আইন পরিবর্তেনর বিষয় নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের লড়াই। সরকার যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা চায়, তবে পুলিশকে একটি দলীয় অনুগত বাহিনী থেকে সরিয়ে জাতীয় একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতেই হবে।
উপসংহারেও বলা যায় ভয়ের বদলে আস্থা: ২০৭৫ সালের বাংলাদেশ যদি একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হতে চায়,
তবে তার প্রথম শর্ত হালো নাগরিক যখন পুলিশের দিকে তাকাবে, তখন যে ভয় পাবে না; বরং সে ভরসা পাবে। ১৮৬১ সালের প্রেতাত্মা বিদায় করার সময় এসে গেছে। ২০২৬ সারে দাঁড়িয়ে আমাদের নেওয়া এই একটি সাহসী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে ২০৭৫ সালের বাংলাদেশের মানুষ কতটা নিরাপদে হাসবে। এখনই সময় জনগণের পুলিশ গড়ার জন্য জনগণের আকাঙ্খা ভিত্তিক একটি আইন ও কমিশন বাস্তবায়ন করা। কারণ, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ঠাঁই নেওয়ার চেয়ে ইতিহাসের নির্মাতা হওয়াই শ্রেয়।
লেখক :
ড. আশরাফুর রহমান
ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট)
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা।
মন্তব্য