সব
আজ ভোটের দিন। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় গণতান্ত্রিক আয়োজন আর নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ব্যালটের নীরব শক্তিই আজ বলে দেবে-গণতন্ত্র কতটা দৃঢ়, আর জনগণের কণ্ঠ কতটা স্বাধীন।
ভোটের দিন মানেই শুধু নির্বাচন নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব পালনের দিন, নিজের ভবিষ্যৎ নিজ হাতে লেখার দিন। একটি ভোট হয়তো সংখ্যার হিসেবে ক্ষুদ্র, কিন্তু সম্মিলিতভাবে সেটিই গড়ে তোলে রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি। তাই ভোটাধিকার প্রয়োগ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়-এটি সাংবিধানিক অধিকার, আবার একই সঙ্গে নৈতিক অঙ্গীকার।
একজন গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত পর্যবেক্ষক হিসেবে আজকের দিনটি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নির্বাচন কেবল দেখার বিষয় নয়, এটি সত্যকে লিপিবদ্ধ করার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।ভোটগ্রহণের শুরু থেকে ফলাফল প্রক্রিয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং যাচাইকৃত, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতারই অংশ। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত হয় শুধু ভোটের মাধ্যমে নয়-বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্য দিয়ে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন ভোটাররা ভয়-ভীতি, প্রভাব কিংবা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন। বহুল আলোচিত “ভোট বিপ্লব” আসলে কোনো দল বা প্রার্থীর বিজয়ের নাম নয়; এটি সাধারণ মানুষের অবাধ অংশগ্রহণের প্রতীক। যখন একজন সাধারণ নাগরিক নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারেন, তখনই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হয় গণতন্ত্র।
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের একজন ভোটার হিসেবে আমার বিশ্বাস-ভোট আবেগ দিয়ে নয়, বিবেক দিয়ে দেওয়া উচিত। প্রতিটি ভোট একটি আমানত; সেই আমানত এমন নেতৃত্বের হাতে অর্পণ করা প্রয়োজন, যারা জনগণের বিশ্বাসকে সম্মান করবে, ক্ষমতাকে ব্যক্তিস্বার্থে নয়, জনকল্যাণে ব্যবহার করবে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন-কার হাতে আমাদের আগামী সবচেয়ে নিরাপদ?
প্রার্থীদের জন্য আজকের বার্তা স্পষ্ট-নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতার, কিন্তু শত্রুতার নয়। সহনশীলতা ও রাজনৈতিক শালীনতা একটি পরিণত গণতন্ত্রের পরিচায়ক। অন্যদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকা, তবে সত্য ও অসত্যের প্রশ্নে অবস্থান হবে স্পষ্ট-সত্যের পক্ষে, অনিয়মের বিরুদ্ধে।
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, আর সাংবাদিকদের জাতির বিবেক। এই বিবেক যখন সততা ও সাহসে অটল থাকে, তখন গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যদি সত্য আড়াল হয়, তবে আস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ে। তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, যে সাংবাদিকতা উত্তেজনা নয়, তথ্য দেয়; বিভ্রান্তি নয়, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে গুজব ও অপতথ্য থেকে। ডিজিটাল এই সময়ে একটি অসত্য খবর মুহূর্তেই অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। মনে রাখতে হবে-গুজব শুধু ভুল তথ্য নয়; এটি সামাজিক স্থিতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তাই যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস নয়, এটাই হোক সচেতন নাগরিকের অঙ্গীকার।
আজকের নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন রাষ্ট্র রেখে যেতে চাই, তারও প্রতিফলন। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই পারে জনগণের আস্থা দৃঢ় করতে এবং বিশ্বদরবারে দেশের গণতান্ত্রিক সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরতে।
নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সততা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে একে অপরকে সার্বিক সহযোগিতা করুন। সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধই নিশ্চিত করতে পারে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, যেখানে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে গণতন্ত্র, আর শক্তিশালী হবে বাংলাদেশ।
মন্তব্য