সব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে বিএনপি ২০৯ আসনে বিজয়ী হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। জাতীয় নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর দলে মন্ত্রীপরিষদ ও সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গেজেট প্রকাশের পর যত দ্রুত সম্ভব সরকার গঠন করতে চায় বিএনপি। ইসির গেজেটের পর শপথ শেষে দ্রুত সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার দিকে যাবে দলটি।
বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা বিশ্বস্ত রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সরকারে নিয়ে সকলের অংশগ্রহণে দেশ পরিচালনা করতে চায় দলটি। অর্থাৎ অনেকটা জাতীয় সরকার আদলে নতুন সরকার গঠন করতে চায় বিএনপি। দলের সিনিয়র কয়েক নেতার সঙ্গে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের আলাপকালে এ আভাস পাওয়া গেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। দীর্ঘ দুই দশক পর দলটি সরকার গঠন করতে যাওয়ায় এখন সবার নজর আগামী মন্ত্রিসভার দিকে। এই মন্ত্রিসভায় কারা স্থান পাচ্ছেন, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রী পরিষদ ও সরকারের চেহারা বা পরিসর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি বর্তমানে টেবিল ওয়ার্ক করছেন। মন্ত্রীসভায় কে কে স্থান পেতে পারেন সে বিষয়ে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি। সদ্য নির্বাচিত দলের নেতাদের বাইরে বিগত যুগপৎ আন্দোলন শরিক দলগুলোর নেতাদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নতুন করে খোঁজ নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে বিজয়ী কয়েক নেতার পাশাপাশি পরাজিতদেরও টেকনোক্র্যাট কোটায় কাকে কাকে মন্ত্রীপরিষদে স্থান দেবেন তা নিয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও মত বিনিময় করছেন।
সূত্র জানায়, ঠাকুরগাঁও থেকে আজ বিকালে ফিরে চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে মহাসচিবের সঙ্গে বেশকিছুক্ষণ আলোচনা করেন তারেক রহমান। এ সময় তাদের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও ছিলেন।
বিএনপির একাধিক নেতা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিগত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ‘চাপ সহ্য’ করেও বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রী পরিষদে ঠাঁই পেতে পারেন। নতুন মন্ত্রীসভায় তারেক রহমান প্রবীণের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণদের প্রাধাণ্য দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী পরিষদে ঠাঁই পেতে পারেন বেশ কিছু তুলনামূলক তরুণ বয়সী নেতা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, আগামীকালের (১৪ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর আগামী ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
আসিফ নজরুল বলেন, ফলাফলের গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশের পর যত দ্রুত সম্ভব নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন, ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই অর্থাৎ পবিত্র রমজান শুরুর আগেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
এদিকে, আগামী সোমবারের (১৫ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে সরকার গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন হবে। বিএনপি সব দলকে নিয়ে পার্লামেন্টে যাবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাই সনদে বিএনপি যে বিষয়গুলোতে সই করেছে, ধাপে ধাপে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফাও বাস্তবায়ন করা হবে। দলের নিরঙ্কুশ বিজয়কে বিএনপির প্রতি জনগণের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, আগামী পাঁচ বছর এ দেশের কল্যাণের দায়িত্ব জনগণ বিএনপি ও দলের নেতা তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করেছে। এই নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়েছে এবং বিএনপির সঙ্গে যারা জোটে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেও বিজয়ী হয়েছেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রীসভায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণদের স্থান হতে পারে। বলতে পারেন প্রবীণ-নবীনের মিশেলে একটি দক্ষ টিম দেশ পূণর্গঠনে নেতৃত্ব দেবে। লক্ষ্য হচ্ছে-আইনশৃঙ্খলা উন্নতির পাশি অর্থনৈতিক পূণর্গঠন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
মন্ত্রীপরিষদ গঠন ও কেমন হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
নতুন সরকারের লক্ষ্য সম্পর্কে সালাহউদ্দিন বলেন, আমাদের লড়াই ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা একটি মেধা ও প্রযুক্তি নির্ভর রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার এবং ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করা হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্বাধীনতার পর এই সংসদই হবে সবচেয়ে বেশি আইন প্রণয়নকারী এবং জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলক। নতুন সরকারের তিনটি মূল অগ্রাধিকার হবে–আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নির্মূল করা।
নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা আশা করছি আজ (শুক্রবার) বিকেলের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশ করবে। এরপর সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের তোড়জোড় ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি পরিবহন পুল প্রায় ৫০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর জন্য গাড়ি প্রস্তুত রাখছে। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
মন্তব্য