সব
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের গাজীপুর এলাকায় ১৪৭নং সাব্দুল সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা ‘ইকো ব্রিকস’ নামের অনুমোদনহীন ইটভাটা এখন আর শুধু পরিবেশ দূষণ বা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়, এটি প্রকাশ্যে চলমান প্রশাসনিক ঘুষ-বানিজ্যের গুরুতর অভিযোগকে সামনে এনেছে।
বিদ্যালয়ের একশত গজের ভিতরে দিনের পর দিন ইট পোড়ানো হলেও জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও ইটভাটাটি বহাল থাকায় সাধারণ মানুষ নিশ্চিত আইনের চোখ বন্ধ রাখতে নিয়মিত অবৈধ লেনদেন হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা দণ্ডনীয় অপরাধ। তা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের বুক চিরে কীভাবে একটি ইটভাটা গড়ে ওঠে এবং প্রকাশ্যে ইট পোড়ায় এই প্রশ্নের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে এলাকাবাসী দেখছেন প্রশাসনের ভেতরের যোগসাজশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মৌসুম এলেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ইটভাটা মালিকদের সমঝোতা হয়।
অভিযোগ আছে, মাসিক ‘ম্যানেজমেন্ট’ নিশ্চিত হলেই পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি থেমে যায়, জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত আর সেখানে পৌঁছায় না। ফলে আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না।
বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা বলছেন, শিশুদের শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা নিয়ে বারবার অভিযোগ জানালেও প্রশাসনের কোনো দপ্তর দায় নিতে চায়নি। উল্টো, কেউ কেউ ‘উপর থেকে দেখার’ আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতে করে প্রশ্ন উঠছে-শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ কি ঘুষের টাকায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে?
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটা শনাক্ত ও বন্ধ করার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। একইভাবে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ ও উচ্ছেদের চূড়ান্ত ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের হাতে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এই দুই প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তা কাকতালীয় নয়; বরং তা একটি সুসংগঠিত সুবিধাভোগী চক্রের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন এখন আর ‘ইটভাটা বন্ধ হবে কি না’-এতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, কারা এই অবৈধ ইটভাটাকে সুরক্ষা দিচ্ছে এবং বিনিময়ে কত টাকার লেনদেন হচ্ছে? কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরবতা যত দীর্ঘ হচ্ছে, ঘুষ-বানিজ্যের অভিযোগ ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এভাবে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুক চিরে অবৈধ ইটভাটা টিকে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়-এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে অর্থের বিনিময়ে জলাঞ্জলি দেওয়ার ভয়াবহ নজির। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা খতিয়ে না দেখা হলে, এই ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
মন্তব্য