সব
সংবাদ প্রকাশের কারণে নারী সাংবাদিককে হেনস্তা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর উত্তরা জোনের এক ইমারত পরিদর্শককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ইমারত পরিদর্শক অর্পি রুবেলকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি থানা হেফাজতে রয়েছেন এবং আজকে ১৩ তারিখ সকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করার কথা রয়েছে।
মামলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার জোয়ার সাহারা মৌজায় একাধিক দাগের জমিতে অনুমোদিত নকশা অমান্য করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছিল। এ বিষয়ে প্রথমে ২০২৩ সালের ২০ মার্চ রাজউকের পক্ষ থেকে ভবন মালিককে অনুমোদিত নকশা দাখিলের নির্দেশ দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ২ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ২৬ জুলাই চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করা হলেও ভবন মালিক কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, নোটিশের পরও দীর্ঘ সময় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভবনটি নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও ওঠে।
এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে “১০ লাখ টাকা মৌখিক চুক্তি” শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সংবাদ প্রকাশের পরদিনই হঠাৎ করে সংশ্লিষ্ট ভবনের বিরুদ্ধে তাগিদপত্র জারি করা হয়, যা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর সকালে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মেরিনা রেমি, সহকর্মী ইসরাত জাহান রুপা ও সোনিয়া আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে রাজউকের উত্তরা জোনাল অফিসে ফলোআপ প্রতিবেদন তৈরির জন্য যান। সেখানে অভিযুক্ত ইমারত পরিদর্শক অর্পি রুবেল তাদের পথরোধ করেন এবং প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে অর্পি রুবেল ফোন করে কয়েকজন ব্যক্তিকে ডেকে এনে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। সহকর্মীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিককে মারধর ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১০ ও ৩০ ধারায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলার প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। নতুন তদন্ত কর্মকর্তার অধীনে পুনঃতদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, আদালতের জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে।
মামলার বাদী সাংবাদিক মেরিনা রেমি বলেন, “আমি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে।
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। তারা অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়েরকৃত এ ধরনের মামলায় প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের বিষয়ে বারবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও কেন সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
মন্তব্য