ত্রিশালে বিয়ের নামে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ, ১১ মাসেও বিচার পাননি ঐশী; পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মামলা নং: ৯৬২/২৬ | গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নং: ১৫১৬/২৬
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় বিয়ের নামে প্রতারণা, যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং স্ত্রীকে ফেলে রেখে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ উঠেছে হামিদুল আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও দীর্ঘদিনেও অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
ঘটনাটি ঘটেছে ত্রিশাল উপজেলার দানিখোলা ইউনিয়নের পাগলার বাজার হাপানীয়া এলাকায়। ভুক্তভোগী ঐশী আক্তার প্রায় ১১ মাস ধরে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। পরিবারের অভিযোগ, একদিকে দাম্পত্য জীবনে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে আদালতের দ্বারস্থ হয়েও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আইনি প্রতিকার পাচ্ছেন না।
দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে, দুই দিন পর থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহের হালিম শেখের মেয়ে ঐশী আক্তারের সঙ্গে ত্রিশালের দানিখোলা পাগলার বাজার এলাকার আশরাফুলের ছেলে হামিদুল আহমেদের পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হয়। বিয়েতে এক লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে ১০ হাজার টাকা উসুল দেখিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই দিন পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে অভিযোগ পরিবারের। শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ না করার অজুহাতে ঐশীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
মেয়ের বাড়ি থেকে বিভিন্ন জিনিস দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে তাকে নিয়মিত চাপ দেওয়া হতো বলেও জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। এমনকি স্বামীর বোনের জামাইদের মোটা অঙ্কের সম্মানী দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়নি—এমন অভিযোগেও ঐশীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
বাবার বাড়িতে আশ্রয়, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ
একপর্যায়ে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ঐশী বাবার বাড়িতে চলে আসেন। পরিবারের অভিযোগ, এরপর স্বামী হামিদুল আহমেদ তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে ঐশী কিংবা তার পরিবারের খোঁজখবরও নেননি তিনি।
এ অবস্থায় ঐশী ও তার পরিবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির শরণাপন্ন হন। পরিবারের দাবি, পাগলার বাজার এলাকার চেয়ারম্যান সালিশের মাধ্যমে দেনমোহরের কিছু টাকা পরিশোধ করে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রশ্ন, একজন নববধূর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং স্ত্রীকে ফেলে রেখে দ্বিতীয় বিয়ের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু কিছু টাকা পরিশোধের আশ্বাসই কি যথেষ্ট? এসব অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার ও আইনি প্রতিকার কোথায়?
মামলা নং ৯৬২/২৬, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নং ১৫১৬/২৬—তবুও গ্রেপ্তার নেই
পরিবারের দাবি, ন্যায়বিচারের আশায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন তারা। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়, যার মামলা নম্বর ৯৬২/২৬। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়, যার পরোয়ানা নম্বর ১৫১৬/২৬।
কিন্তু আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও অভিযুক্তরা এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে।
পরিবারের অভিযোগ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের দায়িত্বে থাকা ত্রিশাল থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তারা কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছেন না। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আসামিদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এ ছাড়া অভিযুক্তরা স্থানীয় প্রভাব ও আর্থিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আইনের আওতার বাইরে থাকার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ক্ষুব্ধ পরিবারের প্রশ্ন আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই?
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তারপরও যদি আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আদালতের আদেশের কি কোনো মূল্য নেই?”
তারা আরও বলেন, “প্রায় ১১ মাস ধরে আমাদের মেয়ে বাবার বাড়িতে পড়ে আছে। ন্যায়বিচারের আশায় এক দরজা থেকে আরেক দরজায় ঘুরছি। অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এখনো আইনের আওতায় আসেনি। একজন অসহায় মেয়ের বিচার পাওয়ার অধিকার কি এতটাই মূল্যহীন?”
প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা
ভুক্তভোগী ঐশী আক্তার ও তার পরিবার ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার এবং ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের দাবি, আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকর করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরোয়ানা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা কিংবা প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও কেন অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না? পরোয়ানা কার্যকরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী? কোনো অবহেলা থাকলে তার দায়ভার কে নেবে?
একজন ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচারের আশায় আর কত দিন অপেক্ষা করবেন?
ঐশী আক্তারের পরিবার এখন আর কোনো আশ্বাস নয়, চায় আদালতের আদেশের যথাযথ বাস্তবায়ন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার।।

রিক্তা খান, ময়মনসিংহ।।।।