প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:০৮ অপরাহ্ণ প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

উন্নয়নের দৃশ্যমান অবকাঠামো হচ্ছে, কিন্তু জ্ঞান ও উদ্ভাবনের ভিত কতটা শক্ত হচ্ছে?

অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে গত দুই দশকে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
কিন্তু বাস্তব চিত্র আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণা ও উন্নয়ন জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় ছিল জিডিপির ০.৩৫ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ০.৩১ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ০.৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ছে, অথচ গবেষণায় বিনিয়োগের অনুপাত কমছে—এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়।
প্রশ্নটি তাই সরাসরি—আমরা কি ভবিষ্যৎ নির্মাণে যথেষ্ট বিনিয়োগ করছি?
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এগুলো উন্নয়নের দৃশ্যমান ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি হলো জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্ভাবন।
আর সেই ভিত্তি তৈরি হয় গবেষণার মাধ্যমে।
বিশ্ববিদ্যালয়: গবেষণার প্রাণকেন্দ্র, কিন্তু বরাদ্দ কত?
উচ্চশিক্ষা খাতের দিকে তাকালে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউজিসির আওতাধীন ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রায় ১৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৯০ কোটি টাকা—সামগ্রিক বরাদ্দের মাত্র ১.৪৪ শতাংশ।
এখানে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরাদ্দ ব্যবহারের সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে।
কোথাও কোথাও বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গবেষণা পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার সামনে একসঙ্গে দুটি চ্যালেঞ্জ—
অর্থের ঘাটতি এবং অর্থ ব্যবহারের দুর্বলতা।
ল্যাবরেটরি বানালেই গবেষণা হয় না
গবেষণায় মোট ব্যয়ের বড় অংশ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর মতো মূলধনি খাতে যাচ্ছে। আধুনিক ল্যাবরেটরি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি ল্যাবরেটরি নির্মাণ করলেই গবেষণার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
প্রয়োজন দক্ষ গবেষক, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, ধারাবাহিক অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, গবেষণাবান্ধব পরিবেশ এবং গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ।
গবেষণাগার নির্মাণ শুরু হতে পারে—কিন্তু গবেষণার সাফল্য নির্ভর করে মানুষ, অর্থ, সময় ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশকে গতি বাড়াতেই হবে
আঞ্চলিক চিত্রও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা বহন করে। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়া জিডিপির প্রায় ৫.২ শতাংশ, চীন ২.৬ শতাংশ, ভারত প্রায় ০.৬ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম প্রায় ০.৪ শতাংশ ব্যয় করে; বাংলাদেশের হার প্রায় ০.৩০ শতাংশ। বিভিন্ন দেশের তথ্যের সময়কাল ও উৎস ভিন্ন হওয়ায় এগুলো সরাসরি তুলনার বদলে নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত। তবে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার প্রবণতাটি স্পষ্ট।
গবেষণা প্রকাশনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, একটি সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের Scopus-সূচিভুক্ত প্রকাশনা ছিল আনুমানিক ৮ হাজার; পাকিস্তানে প্রায় ২৮ হাজার এবং ভারতে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার। Global Innovation Index 2022-এ ১৩২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০২তম।
এই পরিসংখ্যান আত্মতুষ্টির নয়—বরং ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ।
গবেষণায় অর্থ চাই, কিন্তু চাই জবাবদিহিও
গবেষণার বাজেট বাড়ানো জরুরি। তবে শুধু বাজেট বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন—
১. গবেষণা ব্যয় ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ১ শতাংশে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২.৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা।
২. একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা পরিষদ অথবা সমন্বিত জাতীয় গবেষণা তহবিল।
৩. স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও ফলাফলভিত্তিক গবেষণা অর্থায়ন।
৪. তরুণ গবেষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনুদান, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক গবেষণা সুবিধা।
৫. বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব।
৬. গবেষণার ফলাফলকে কৃষি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পরিবেশ, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তির বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা।
৭. গবেষণার মূল্যায়নে শুধু প্রকাশনা নয়—পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নীতিনির্ধারণে অবদান এবং সামাজিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া।
সম্পাদকের কথা
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগামী দিনের অর্থনৈতিক শক্তি নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর।
আমরা যদি শুধু আজকের প্রয়োজন মেটাতে বিনিয়োগ করি, তাহলে উন্নয়ন হয়তো এগোবে; কিন্তু আগামী দিনের বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি হবে না।
তাই গবেষণাকে ব্যয় হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
গবেষণায় যে টাকা আজ ব্যয় হবে, তার পূর্ণ সুফল হয়তো আগামীকাল পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেই বিনিয়োগই আগামী দিনের কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
আমরা কি শুধু উন্নয়নের অবকাঠামো বানাব, নাকি সেই উন্নয়নের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎও নির্মাণ করব?
 সম্পাদকীয় অবস্থান স্পষ্ট—
গবেষণায় বিনিয়োগ কমিয়ে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক শক্তিশালী অর্থনীতি হতে পারে না।
গবেষণায় বিনিয়োগ কোনো বিলাসিতা নয়।
এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপরিহার্য বিনিয়োগ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ মাইন উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রধান সম্পাদকঃ শিবলী সাদিক খান, নির্বাহী সম্পাদকঃ জহির রায়হান,  বার্তাকক্ষঃ 75bdnews@gmail.com

প্রিন্ট করুন