আগুনের ঘটনার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন মারা গেছেন। তবে তাদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা যায়নি বলে প্রমাণ পায়নি প্রশাসন। এর মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রশাসন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেকে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হন। এরপর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তাঁদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির।
হাসপাতাল পরিদর্শন করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন- এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পাঁচজনের মৃত্যুর একটি তালিকার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, এর মধ্যে একজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ চিকিৎসকেরা এখনো স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি।
তবে আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানান বিভাগীয় কমিশনার। তাঁদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া বা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।
হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির একটি বন্ধ থাকার কারণে রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েন- এমন অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার বলেন, বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালের কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালের কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি সাংবাদিকদের ওই রোগীকে দেখে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্য বলেন, জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
হাসপাতালে নিচতলা থেকে আট তলা পর্যন্ত ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জের আবদুল করিম। হাসপাতালের পঞ্চম তলার নেফ্রোলজি বিভাগে ভর্তি। এই রোগী সোমবারের দুর্ঘটনার বিষয়ে বলেন, আগুন লাগার পর সবাই হইচই শুরু করেন। তিনি ওই সময় মেঝেতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সামনেই একটি সিঁড়ি ছিল। সেটি দিয়ে নিচে নেমে তালা দেখতে পান। পরে তালা ভেঙে বের হন কয়েকজন। না বের হতে পারলে কী হতো, সেই ভয়–আতঙ্ক এখনো তাঁর মনে।
হাসপাতালের অষ্টম তলায় আগুনে পোড়া অংশ দেখছিলেন হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের স্বজনেরা। তাঁদের একজন হাদিসা খাতুন বলেন, হুট করে চতুর্দিক (চারদিক) ধোঁয়া দেহি। আমরা নিচে নামবার পাই নাই। সবাইরে বিল্ডিংয়ের এক দিকে রাখা হয়ছিল।
আগুন বেশি না ছড়ালেও ধোঁয়ার কারণে অনেকে বমি করছিলেন এবং অসুস্থ বোধ করছিলেন বলে দাবি হাদিসার। শিশুদের নিয়ে একটি কক্ষের এক কোণে থাকার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে তাঁদের আবার ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা এসে রোগীদের দেখে যান বলে তিনি জানান।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন কার্য দিবসের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, অগ্নিকান্ডের ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সহকারী পরিচালক আরও জানান, এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। তিনি নিজে সদস্যসচিবের দায়িত্বে আছেন। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনজনের স্বজন। তাঁরা হলেন তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫), ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মিয়া (৪৫) এবং কালাদহ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ গ্রামের কাঠ মিস্ত্রি রমজান আলী।
তারাকান্দার কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, কুলসুম ১২ দিন ধরে তাঁর জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। কুলসুমের সঙ্গে তাঁর ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও ছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাজমা বলেন, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম তাঁর ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন, লোকজন তাঁর ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
নাজমার ভাষ্য, পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তাঁর শ্বাস ছিল। খবর পেয়ে নাজমা হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাঁরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
রবিবার সকালে বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন ফুলবাড়িয়ার রমজান আলী মিন্ত্রি। চিকিৎসা তার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে। তিনি হাসপাতালের চার তলায় ভর্তি ছিলেন।
তার ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি কাঠ মিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি দুটি বিয়ে করেছেন। দুই স্ত্রীর নামই খাদিজা। একজনের বয়স (৩৪), অপরজনের বয়স ২৭ বছর। দুই স্ত্রীর ঘরের দুটি করে ছেলে মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে রমজানের দুই স্ত্রী অন্তসত্ত্বা বলে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম।
হাসপাতালে তার থাকা স্ত্রী খাদিজা বলেন, আমরা চার তলায় ভর্তি ছিলাম। আগুন লাগার খবর নামার সময় সিড়িতে পড়ে রমজান। তখন মানুষের পদদলিত হয়ে মারা যায়। স্বামীকে বাঁচাতে নিয়ে আসলাম হাসপাতালে, সেই হাসপাতালের আগুনেই মারা গেলেন স্বামী। আমার স্বামীর দুটি সংসার। দুই সংসারই এখন অথই সাগরে ভাসছে। কিভাবে চলবে সংসার- স্বামী হারানোর বেদনা ও সংসার চালানো চিন্তায় বারবার মোর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
বিদ্যানন্দ গ্রামের শাহজাহান মিয়ার স্ত্রী হারিছা খাতুন বিলাপ করে শেষ বারের মতো স্বামীর মরদেহ দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি ও আমার বড় বোন জাহানারা আমার স্বামীর সাথে ছিলাম। যখন আগুন লেগে যায় তখন আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে ছিলাম। দুই/তিন সিঁড়ি নামার পর হঠাৎ আমি পড়ে যাই। পরে আমি আর কিছু বলতে পারি না। পরে আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন আমি যাকেই জিগাই (জিজ্ঞাসা করি) তারা বলে বেঁচে আছে কেউ বলে ইমারজেন্সিতে, কেউ বলে আইসিইউতে।
মৃত নাজিম উদ্দিন মন্ডলের ছেলে শাহজাহান (৪৫)। পেশায় তিনি একজন পল্লী চিকিৎসক ছিলেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর পূর্বপাড়া মাহার বাজার বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। ছেলে হারানোর শোকে বৃদ্ধ মা, ভাই হারানোর শোকে বোন, ভাইপো হারানোর শোকে ফুফুরা কান্নাকাটি করছেন।
নিহতের ছোট ভাই কামরুজ্জামান বলেন, ঘটনার দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা হাসপাতালে ছিলাম। আমরা অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ আগুনের খবরে বাড়ি থেকে আমরা দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করি। ভাইয়ের (রোগির) নম্বরে ফোন দিলে একজন নার্স ফোন ধরেন। পরে ইমারজেন্সিতে গেলে আমাদের ফোনটা দিয়ে দেয়। আমরা সেখানে ভাইয়ের লাশ দেখতে পাই। এ সময় আমাদের আউট পাশ দেওয়া হয়। ৪ হাজার টাকায় একটা এম্বুলেন্স যোগে আমরা ভাইকে বাড়িতে নিয়ে এসে আজ মঙ্গলবার সকাল ১১টায় দাফন করি।
অগ্নিকান্ডের সময় ৫টি সিঁড়ির ৪টিতেই তালা ছিল
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতে তালা লাগানো ছিল। সোমবার বিকেলে অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করায় ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আটতলা নতুন ভবনটিতে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি আছে। লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালা দেওয়া থাকত। চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার গেটে তালা ঝুলছে। কয়েকটি গেটে মরিচা ধরেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনেরা এসব গেট ও তালা ভেঙে বের হয়েছেন। কয়েকটি গেট এখনো ভাঙা অবস্থায় আছে।
হৃদরোগ বিভাগে দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে রোগীরা হতাহত হয়েছেন। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না। কী কারণে সিঁড়িগুলো বন্ধ রাখা হয়, তা তিনি জানেন না।
‘সিঁড়ি তালা মারা থাকবে কেন ?
ময়মনসিংহ নগরীর চর ঈশ্বরদিয়া গ্রামের জোবেদা খাতুন গত রবিবার হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি হন। তিনি হাসপাতালের করিডরে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে থাকা মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গেট তালাবদ্ধ ছিল। পরে মানুষ তালা ও গেট ভেঙে বাইরে বের হন। জোবেদা খাতুন বলেন, আগুন দেখে মনে হচ্ছিল কেউ বাঁচবে না। পরে মানুষ দৌড়াদৌড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। গেটগুলো খোলা থাকলে কষ্ট অনেক কম হতো।
হাসপাতালের ছয়তলার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু বিভাগে ভাতিজিকে নিয়ে ভর্তি আছেন তারাকান্দার মনির হোসেন। তিনি বলেন, আতঙ্কিত মানুষ বিভিন্ন জায়গা দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় ভাঙা বেড, বেডশিটসহ বিভিন্ন জিনিস সিঁড়িতে পড়ে থাকায় অনেকে আহত হন। নামার সময় একজনের ওপর আরেকজন পড়ে যাচ্ছিলেন। শিশুদের নিয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।
সিড়ি বন্ধ থাকার বিষয়ে যা বলছে হাসপাতাল প্রশাসন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি ও সাতটি লিফট রয়েছে। সাতটি লিফটের মধ্যে একটি বিকল ছিল এবং সেটি মেরামতের কাজ চলছিল। ওই লিফটের কন্ট্রোল রুমেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে জানিয়েছে। তবে সেটিই আগুন লাগার কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে জানান মাইনউদ্দিন খান। নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি দিয়ে নিয়মিত মানুষ চলাচল করেন জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, অন্য সিঁড়িগুলো সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। নিরাপত্তার কারণে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়। তবে আজ সিঁড়িগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ১১ নম্বর লিফটটি সচল ছিল না, এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ ছিল। সেখানে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আজ তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। এরপর বিস্তারিত তদন্ত করে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। অর্ণব বিশ্বাস বলেন, লিফট বন্ধ থাকলেও এর বিদ্যুৎ–সংযোগ বন্ধ থাকে না। ফলে লিফট বন্ধ থাকার পরও কন্ট্রোল রুমের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলোতে বিদ্যুৎ–সংযোগ সচল ছিল। আগুন লাগার কারণ নির্ধারণে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
আগুনের সুত্রপাতের বিষয়ে যা বলছে ফায়ার সার্ভিস
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, লিফটে আগুন লাগলে লিফটের হলের মাধ্যমে বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ও আগুনের ঝিলিক দেখা যায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালের সব সিঁড়ি খোলা থাকলে রোগী ও স্বজনেরা সহজে নিচে নামতে পারতেন। তবে নিরাপত্তার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি সিঁড়ি বন্ধ রেখেছিল।
এই কর্মকর্তার মতে, অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা হুড়োহুড়ি হয়েছিল। তবে সবার প্রচেষ্টায় বড় ধরনের বিপর্যয় হয়নি। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে তাঁর ধারণা। লিফটের কেব্লের মধ্যে আগুন লেগে তা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের বিস্তার ঘটতে পারে। লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে তাঁর ধারণা। লিফটের কেব্লের মধ্যে আগুন লেগে তা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের বিস্তার ঘটতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক।।