প্রকাশের সময়: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ । ৫:০৮ অপরাহ্ণ প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যে মাটিতে প্রাণ দিয়েছিলেন আব্দুল জব্বার, ৫৫ বছর পর সেখানে প্রথম শ্রদ্ধাঞ্জলি

দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি।।
মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার আড়াপাড়া গ্ৰামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৫ বছরেও সেই স্থানটি সঠিকভাবে চিহ্নিত ছিল না। ফলে শহীদের স্মৃতিবিজড়িত সেই স্থানেও এতদিন আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হয়নি।
অবশেষে সহযোদ্ধা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে চিহ্নিত করা হয়েছে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের শহীদ হওয়ার স্থান।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর রোববার (৩০ আগস্ট) প্রথমবারের মতো সেই স্মৃতিবিজড়িত মাটিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন পর শহীদের স্মৃতির স্থানে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ।
আজ (রোববার) সকালে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের উদ্যোগে এ শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময়, উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ শহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সব শহীদের জন্যও মোনাজাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন তালুকদার বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে এই স্থানেই শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি চিহ্নিত ছিল না। পরে যুদ্ধের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানটি শনাক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, স্থানটি চিহ্নিত করার পর প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে একটি স্থাপনা করে দেওয়া হয়। আজ আমরা এখানে এসে প্রথমবারের মতো শহীদ আব্দুল জব্বারের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর তাঁর শহীদ হওয়ার স্থানে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আবেগের ও গর্বের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আব্দুল জব্বার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। ওই যুদ্ধে আমরা মোট ১০ জন ছিলাম। যুদ্ধের একপর্যায়ে আব্দুল জব্বার শহীদ হন এবং আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। আল্লাহর হেফাজতে আমরা বাকিরা বেঁচে যাই। আমি ওই যুদ্ধে তাঁদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলাম। সেই দিনের স্মৃতি আজও আমার মনে অমলিন হয়ে আছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মদন গোপাল শর্মা বলেন, আগে এই জায়গাটি চিহ্নিত ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্দুল জব্বারের সঙ্গে যারা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই জায়গাটি শনাক্ত করা হয়েছে। এখন আমরা সব মুক্তিযোদ্ধা মিলে তাঁর শহীদ হওয়ার স্থানটি চিহ্নিত করতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, এ বছরই প্রথমবারের মতো এখানে শহীদ আব্দুল জব্বারের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া করা হলো। এখন থেকে প্রতিবছরই এই স্থানে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে এই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বীর সন্তান দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু অনেক শহীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এখনও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। শহীদ আব্দুল জব্বারের শহীদ হওয়ার স্থানটি চিহ্নিত হওয়া এবং সেখানে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে শহীদ আব্দুল জব্বারের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও বীরত্বের স্মৃতিচারণ করে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সহযোদ্ধারা তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন।
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর যে মাটিতে দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার, সেই মাটিতে প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে তাঁর আত্মত্যাগ নতুন করে স্মরণ করা হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতে এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ মাইন উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রধান সম্পাদকঃ শিবলী সাদিক খান, নির্বাহী সম্পাদকঃ জহির রায়হান,  বার্তাকক্ষঃ 75bdnews@gmail.com

প্রিন্ট করুন