প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬ । ৭:০৬ অপরাহ্ণ প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

রান্নার পর মাংস সবুজ কেন হয়? ভয় নয়, জানুন এর বৈজ্ঞানিক কারণ

৭৫ বাংলাদেশ ডেস্ক।।
রান্না করা গরু, খাসি, মুরগি কিংবা হ্যামের মাংস কাটতে গিয়ে যদি হঠাৎ সবুজাভ রঙ চোখে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মনে করেন, মাংসটি নিশ্চয়ই বিষাক্ত বা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সবুজ রঙের উপস্থিতি সব সময় একই অর্থ বহন করে না।
বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে মায়োগ্লোবিন (Myoglobin) নামের একটি প্রোটিন, যা মাংসকে স্বাভাবিক লাল রঙ প্রদান করে। এই প্রোটিনের কেন্দ্রে থাকে হিম (Heme) বা পরফাইরিন রিং, যার মধ্যে একটি লৌহ (Iron) পরমাণু অবস্থান করে। এই রিং অক্ষত থাকলে মাংসের রঙ স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু বিভিন্ন রাসায়নিক বা অণুজীবজনিত কারণে এই রিং ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাংসে সবুজাভ রঙের সৃষ্টি হতে পারে।
সবুজ হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ
১. ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন
সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো পচনকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি। এসব ব্যাকটেরিয়া হাইড্রোজেন সালফাইড (Hydrogen Sulfide) গ্যাস উৎপন্ন করে, যা হিম রিংয়ের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সালফমায়োগ্লোবিন (Sulfmyoglobin) নামের সবুজ রঞ্জক তৈরি করে। এ ধরনের সবুজ রঙ সাধারণত মাংস নষ্ট হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। রান্না করলে এই রঙ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কিন্তু পচন দূর হয় না।
২. জারণ (Oxidation)
কিছু ব্যাকটেরিয়া হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে অথবা মাংসের চর্বি জারিত হলে হিম রিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে কোলিগ্লোবিন (Choleglobin) নামের আরেক ধরনের সবুজ রঞ্জক তৈরি হয়। এ অবস্থায় সাধারণত মাংস থেকে অস্বাভাবিক বা দুর্গন্ধও বের হতে পারে।
৩. প্রক্রিয়াজনিত ত্রুটি
হ্যাম, বেকনসহ কিউরড মাংসে গোলাপি রঙ ধরে রাখতে নির্দিষ্ট পরিমাণ নাইট্রাইট ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বা অসমভাবে নাইট্রাইট মেশানো হলে নাইট্রাইট বার্ন (Nitrite Burn) নামে পরিচিত একটি ত্রুটি দেখা দেয়, যার ফলে মাংসে সবুজাভ রঙ দেখা দিতে পারে। এটি অনেক সময় কেবল প্রক্রিয়াজনিত ত্রুটি হলেও এর প্রকৃত কারণ যাচাই করা জরুরি।
রান্নার পরই কেন সবুজ দেখা যায়?
অনেকেই মনে করেন রান্নার কারণেই মাংস সবুজ হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
রান্নার তাপ নতুন করে সবুজ রঙ সৃষ্টি করে না; বরং আগে থেকেই শুরু হওয়া রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলে। তাপের কারণে মায়োগ্লোবিনের গঠন পরিবর্তিত হয় এবং হিম রিং অক্সিজেন ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এসে দ্রুত বিক্রিয়া সম্পন্ন করে। ফলে আগে অদৃশ্য থাকা সবুজাভ আভা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই মাংস কি খাওয়া নিরাপদ?
এর উত্তর নির্ভর করে সবুজ হওয়ার কারণের ওপর।
যদি মাংস থেকে টক, পচা বা সালফারের মতো দুর্গন্ধ বের হয়, তবে তা ব্যাকটেরিয়াজনিত পচনের লক্ষণ হতে পারে এবং এমন মাংস অবশ্যই ফেলে দিতে হবে।
অন্যদিকে, কিউরড মাংসে যদি কেবল প্রক্রিয়াজনিত কারণে সবুজ রঙ দেখা যায় এবং অন্য কোনো পচনের লক্ষণ না থাকে, তাহলে সেটি সব সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নাও হতে পারে। তবে কারণ নিশ্চিতভাবে জানা না গেলে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো
“সন্দেহ হলে মাংসটি খাবেন না; নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিন।”
প্রতিরোধের উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস সবুজ হওয়া অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য—
স্বাস্থ্যসম্মত জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রুত শীতলীকরণ (Rapid Chilling) ও কোল্ড চেইন বজায় রাখতে হবে।
কিউরিং লবণ ও নাইট্রাইট সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।
মাংসকে আলো, বাতাস ও অতিরিক্ত তাপ থেকে দূরে সংরক্ষণ করতে হবে।
সম্পাদকীয় মন্তব্য
মাংসের রঙের সামান্য পরিবর্তন দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সেই পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক কারণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন ভোক্তা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এ ধরনের সমস্যা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব। বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানই নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
লেখক : প্রফেসর ড. মো. আবুল হাশেম :
অধ্যাপক, প্রাণিবিজ্ঞান (Animal Science) বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU), ময়মনসিংহ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ মাইন উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রধান সম্পাদকঃ শিবলী সাদিক খান, নির্বাহী সম্পাদকঃ জহির রায়হান,  বার্তাকক্ষঃ 75bdnews@gmail.com

প্রিন্ট করুন