প্রকাশের সময়: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ । ৯:১৩ অপরাহ্ণ প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার এর বিরুদ্বে ঘাপলা

স্টাফ রিপোর্টার।।

চার বছর আগে প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৩৫টি উপজেলায় ৮২টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক বছর আগে এসে বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬টি সেতুর। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। ১৬টি সেতুর নকশা দীর্ঘদিনেও সম্পন্ন হয়নি, ১৬টি সেতুর কাজ এক শতাংশও এগোয়নি এবং ১২টি সেতুর নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই পুরো প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, তদারকি, নির্মাণমান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডিপিপি প্রণয়নে মাঠপর্যায়ের বাস্তব কারিগরি তথ্য, হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল বিশ্লেষণের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে একাধিক প্যাকেজ বাস্তবায়নযোগ্যতা সংকটে পড়ে এবং শুরু থেকেই প্রকল্পটি নানা জটিলতায় নিমজ্জিত হয়।

প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করছে এবং শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক হিসেবে শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দারের নেতৃত্বে প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রতি ছয় মাসে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও চার বছরে উভয় কমিটির মাত্র চারটি করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সময়মতো সমস্যা শনাক্ত ও সমাধানের সুযোগ নষ্ট হয়েছে বলে আইএমইডি মনে করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে নিয়োজিত ৪৭ জন পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জন রাজধানীতে অবস্থান করে মাঠপর্যায়ে কার্যত অনুপস্থিত ছিলেন। এ পর্যন্ত তারা প্রায় ১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেও অধিকাংশ সময় এলজিইডির সদর দপ্তরেই কাটিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি এবং একাধিক সেতুতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এমনকি পাঁচটি সেতুতে উলম্ব (ভার্টিক্যাল) ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছে আইএমইডি।

পরিকল্পনা ও তদারকির দুর্বলতার প্রভাব সরাসরি নির্মাণকাজেও পড়েছে। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী নদীর ওপর ৩১০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বালির পরিবর্তে মাটি এবং খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। গার্ডারের রড দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় মরিচা ধরেছে এবং যথাযথ কিউরিংও করা হয়নি। মাগুরা সদর উপজেলার ভাবনহাটি–ট্রিকারখালি সড়কের সেতু নির্মাণেও চুক্তি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুতে সম্পূর্ণ নদী বাঁধ দিয়ে সাটারিং করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়নি, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং চুক্তি লঙ্ঘনের পরও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। নিবিড় তদারকির অভাবে ঠিকাদাররা চুক্তির শর্ত অমান্য করে কাজ করলেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের অগ্রগতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। এ পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মিটার সেতু, যার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১৪ হাজার ১৯৭ মিটার সেতুর কাজ এখনো চলমান। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি, ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি এবং ১৪টি সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

একই সঙ্গে আইএমইডি উল্লেখ করেছে, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি খাতে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ নকশা এলজিইডির নিজস্ব ডিজাইন ইউনিট দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরে বুয়েট থেকে ভেটিং নেওয়া হয়েছে। তবু একাধিক সেতুর নকশায় ত্রুটি থেকে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার অভিযোগগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, বর্তমানে মাত্র তিনটি সেতুর ডিজাইন বাকি রয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কোনো ত্রুটি ছিল না, পরামর্শকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সব ঠিকাদার দায়সারা কাজ করছেন—এমন অভিযোগও সঠিক নয়। কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে আইএমইডির মূল্যায়ন বলছে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বল পরিকল্পনা, অপর্যাপ্ত তদারকি, পরামর্শকদের দায়িত্বহীনতা, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সময়মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। প্রকল্পটির সার্বিক বাস্তবায়নের দায়িত্ব যেহেতু প্রকল্প পরিচালকের ওপর ন্যস্ত, তাই এসব অনিয়ম, ধীরগতি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রশ্নে তার ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ মাইন উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রধান সম্পাদকঃ শিবলী সাদিক খান, নির্বাহী সম্পাদকঃ জহির রায়হান,  বার্তাকক্ষঃ 75bdnews@gmail.com

প্রিন্ট করুন