ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ ১১ আসনের ৪৩ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপুর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার মোট ১৩৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৩টি কেন্দ্রকেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট ১৩৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৩টি কেন্দ্রকেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে ৭৮২টি। অর্থাৎ, জেলার প্রায় ৪৩ শতাংশ কেন্দ্রেই বিশেষ নজরদারি ও বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে।
গোয়ান্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ত্রিশাল ও ভালুকা উপজেলায়। উভয় উপজেলায় ৭২টি করে কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সদর (ময়মনসিংহ ৪) এলাকায় ৬৫ এবং পাগলা থানায় ৫৮ কেন্দ্রকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলার মধ্যে ফুলবাড়িয়ায় ৫০, ঈশ্বরগঞ্জে ৪৭, নান্দাইলে ৪৩ এবং গৌরীপুরে ৪২ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। তুলনামূলক কম ঝুঁকি রয়েছে হালুয়াঘাট (২০), ধোবাউড়া (২৫), ফুলপুর (১৯), তারাকান্দা (২৯), মুক্তাগাছা (১৯) এবং গফরগাঁও (২২) এলাকায়। এর মধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় ভোটার ও প্রার্থীদের মাঝে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ময়মনসিংহ সদর এলাকার সিরতা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, চরখরিচা উচ্চ বিদ্যালয়, সানাদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরানগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোরর চর উচ্চ বিদ্যালয়, বিদ্যাগঞ্জ রানী রাজবালা উচ্চ বিদ্যালয়।
মুক্তাগাছা থানার চেচুয়া উচ্চ বিদ্যালয়, গাবতলী উচ্চ বিদ্যালয়, নরকোণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ত্রিশাল থানার রুদ্র গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বৈলর কানহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ভালুকা থানা এলাকার ভালুকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ভালুকা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। গফরগাঁও থানার চারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর মসলন্দ জিরাতি পাড়া দাখিল মাদ্রাসা।
এ ছাড়া, গৌরীপুর থানার শাহগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, চল্লিশা কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভালুকাপুর উচ্চ বিদ্যালয়।
নান্দাইল থানার রসুলপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
হালুয়াঘাট থানার লক্ষীকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘিলাভূই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বদেশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর মতো কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানা গেছে।
মুক্তাগাছার চেচুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল আওয়াল বলেন, তিনি দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ এই বিদ্যালয়ে নির্বাচন দেখে আসছেন। বিগত জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। প্রভাবশালীরা এখানে কেন্দ্র দখলের জন্য লোকজন নিয়ে এসে হামলা চালিয়েছে।
ময়মনসিংহ সদর এলাকার বোরোরচর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচনের সময় এই এলাকায় এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করে। বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ভোটগ্রহণের দিন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা চাই ভোটাররা যেন নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে পারেন।
প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, এই কেন্দ্রে যেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়, যাতে কোনো পক্ষই বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ না পায়। দুইদিন আগে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার স্বার্থে ৮টি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে।
জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সাধারণত ভোটকেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনের সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনা করে এই তালিকা তৈরি করা হয়।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও আনসার সদস্যদের বিশেষ দল থাকবে। এ ছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল দল নিয়মিতভাবে এই কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হালুয়াঘাট উপজেলার একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লে এখনো আতঙ্কিত বোধ করি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতা এবং তাদের অনুসারীরা এই কেন্দ্রটিকে রীতিমতো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে থাকত। তখন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো থেকে শুরু করে প্রিসাইডিং অফিসারকে চাপের মুখে রেখে ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটিয়েছে। ওই সময় প্রভাবশালীদের দাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেক ক্ষেত্রে অসহায় ছিল।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের গোয়েন্দা তথ্য এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এবার কাউকে দেওয়া হবে না। আমরা ইতোমধ্যে কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করছি এবং ভোটের দিন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সাথে আমাদের সমন্বয় থাকবে। সাধারণ ভোটারদের আশ্বস্ত করতে চাই, আপনারা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসবেন। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা পেশিশক্তি ব্যবহারের চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
ময়মনসিংহ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান বলেন, যে সকল কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকবে। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের গায়ে বডি-ওর্ন ক্যামেরা লাগানো থাকবে। তা ছাড়াও কোনো সহিংসতা বা উসকানি থাকলে কুইক রেসপন্স টিমের সদস্যরা দ্রুত সেখানে পৌঁছে যাবে।

৭৫ বাংলাদেশ রিপোর্ট।।