উজানের ঢলে রংপুরে তিস্তার তীরবর্তী কয়েক হাজার মানুষ পানি বন্দি

প্রকাশিত: ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ২২, ২০২২

আব্দুল্লাহ আল আমিন।।
উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে রংপুরের তিস্তার তীরবর্তী ৩ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে বসবাসকারী কয়েক হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

রংপুর অঞ্চলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায়, পানি বন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ । তাদের দিন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে। তাঁদের মাঝে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি আর খাদ্যের।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী নোহালী, আলমবিদিতর, কোলকোন্দ, লক্ষিটারী, গঙ্গাচড়া সদর, গজঘণ্টা ও মর্ণেয়া ইউনিয়ন। কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া, টেপামধুকুর, পীরগাছা উপজেলার ছাওলা এবং তাম্বলপুর ইউনিয়নের তিস্তার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাদামসহ বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার বাড়ি হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়ি-ঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন বন্যার্দূগতরা। বন্যায় সবচেয়ে বেশী বিপাকে পড়েছেন বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুরা। লক্ষিটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি এলাকায় শুক্রবার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বানভাসী মানুষের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল খাবার বিতরণ করায়, বন্যা-কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবারের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এদিকে বন্যা দুর্গত মানুষরা গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষিটারী ইউনিয়নের বাগেরহাট-ইচলি গ্রামের আবু সাইদ জানান, ‘তার ০৭ টি গরু তিনদিন আগে উঁচু এক বাড়িতে রেখেছিলাম। এখন তারা আর রাখতে দেয় না। তাই পশু গুলোকে পানির মধ্যেই কোন রকম রেখেছি।

উপজেলার লুৎফর রহমান, সখিনা বেগম ও কাউনিয়ার আব্দুল ওহাব মিয়াসহ বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানান, ‘ভাঙনের ভয়ে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বাস করছি। খাওয়ার অনেক কষ্ট হয়েছে। ছেলে-মেয়ে ও গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়ছি। ‘ এখ পর্যন্ত তেমন সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছি না।

লক্ষীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল-হাদী জানান, তার ইউনিয়নের ৫টি ওয়ার্ডে ইতোমধ্যেই ১০ হাজার বাড়ি-ঘর তলিয়ে গেছে। শুক্রবার যতটুকু পেরেছি সহযোগিতা করেছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।

কোলকোন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ জানান, তার ইউনিয়নের ৬টি ওয়ার্ডের প্রায় ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেখানে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের সঙ্কট তীব্র ভাবে দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদেরকে তেমন সহযোগীতা দিতে পারি নি। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। গজঘণ্টা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী জানান, প্রতিদিনই তার ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ছে। বাদামের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

নোহালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ টিটুল জানান, ওই ইউনিয়নের ১৬ হাজার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের খাবারের তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারুন অর রশিদ, বলেন শুধু সরকারের উপর নির্ভর করলে সমস্যার সমাধান হবে, দেশের বিত্তবান ব্যাক্তিদের সহযোগীতার হাত বাড়াতে অনুরোধ করছি। সকলকে সাধ্য অনুযায়ী পানি বন্দি মানুষদের পাশে দাড়াতে হবে।

বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা এবং নদীপাড়ের মানুষের কাছ থেকে জানা গেছে, তিস্তায় পানি বাড়ায় নীলফামারীর ডিমলার ছাতনাই এলাকা থেকে জলঢাকা, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, সদর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হরিপুরের ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত অববাহিকার ৩৫২ কিলোমিটার এলাকার চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে পানিতে তলিয়ে গেছে। একই পরিস্থিতি ধরলা, ব²পূত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ কুড়িগ্রাম, রংপুৃর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলার। এইসব এলাকার কোথাও কোথাও কোনো কোনো বাড়িতে কোমর অবধি পানি ঢুকেছে। এসব এলাকার উঠতি বাদাম, আমনের চারা, পাট, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ডু্বে গেছে। দুর্গত এলাকায় মানুষ খুবই বিপাকে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত তেমন কোন ত্রাণ-সহযোগিতা তাদের কাছে পৌঁছেনি।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানান, বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলের কারণে ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান জানান, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে নদীপারের মানুষের সমস্যা হচ্ছে। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের ত্রাণ ও শুকনা খাবার দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খয়রাতি নগদ ৯ লাখ টাকা, ১ লাখ প্যাকেট শিশু খাদ্য এবং ১ লাখ প্যাকেট প্রাণী খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।