কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, ২০৬৩ হেক্টর ফসল পানির নিচে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন

প্রকাশিত: ২:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২২

মোঃবুলবুল ইসলাম,কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।।

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে গত ৬ দিন ধরে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যায় পানি বন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। চলমান বন্যায় বাড়ির উঠোন কিংবা ঘরে পানি না উঠলেও চারপাশের রাস্তা ঘাট তলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এ অঞ্চলের মানুষজন।

চলাচলের জন্য নৌকা ও কলা গাছের ভেলা ছাড়া বিকল্প কোন পথ না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে শিশু কিশোর ও বৃদ্ধাদের। বিশেষ করে ভারি বর্ষন ও হঠাৎ সৃষ্ট বন্যায় মাঠে থাকা খড় পানিতে ভেঁসে যাওয়ায় গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, রৌমারীতে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা সৃষ্ট বন্যায় ২ হাজার ৬৩ হেক্টর ফসল পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। এর মধ্যে ভুট্টা, তিল ও পটল ক্ষেত সহ আউশ ব্রি ৪৮ ধান রয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়বে।

বালুর চর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন,৪০ হাজার টাকা খরচ করে ৫ বিঘা জমিতে আড়াই মাসী ধান আউস ব্রি ৪৮ লাগাইছি।হঠাৎ বন্যায় সেই ধান ক্ষেত পানি ডুবে ধান ক্ষেত পচে গেছে।খরচের টাকা তুলবো কিভাবে। না পেলাম খড়, না পেলাম ধান।আমার কি হবে?

গোয়াল গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, আমি তিন বিঘা জমিতে পাট ক্ষেত করেছি।গত ৫-৬ দিন ধরে পাট পানির নিচে ডুবে আছে। আরো কয়েকদিন এভাবে বন্যা পানি বাড়লে আমার পাট ক্ষেত পচে যাবে।

পাহাড়তলী গ্রামে জমিলা বেগম বলেন,বন্যা শুরু হলে আমাদের কষ্টের সীমা থাকে না।খাওয়া চলাফেরা সব কিছুতেই দূর্ভোগ শুরু হয়।বাড়ির চারদিকে পানি থৈ থৈ ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ কাউয়ুম চৌধুরী জানান,রৌমারী বন্যায় প্রায় ২০৬৩ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বন্যায়। পানির দীর্ঘ স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমান আরও বাড়বে।

সরকারি সহায়তা ব্যাপারে কথা হলে তিনি জানান,বন্যায় ঘাটতি কিছুটা পুষে নিতে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা তৈরি ও আমনে সার বীজ ও প্রনোদনার বিষয়টি উর্ধতন কর্মকর্তাকে অবগত করা হবে।

এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পোড়ারচর ও পূর্ব তিন হাজারী গ্রাম প্লাবিত হয়ে অাকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে নিম্নাঞ্চলের এই দুই গ্রামের অন্তত শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পরেছে।

বুধবার (১৫ জুন) দুপুরে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সুত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদ সীমার ১১৫ সেন্টিমিটার, সদর পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৭৬ সেন্টিমিটার বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) অানোয়ার হোসেন জানান, ভারী বর্ষন ও উজান থেকে নেমে অাসা পাহাড়ী ঢলে গত সাত দিন ধরে ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি অব্যাহত থাকায় যাত্রাপুর ইউনিয়নের সব থেকে নিম্নাঞ্চল পোড়ারচর ও পূর্ব তিন হাজারী নামের দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে পোড়ার চরের ৪০ পরিবার ও পূর্ব তিন হাজারী গ্রামের ৬৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পরেছে। পূর্ব তিন হাজারী গ্রামের ৬৫টি পরিবার গত তিন দিন আগে পানিবন্দি হলেও আজ মঙ্গলবার (১৪ জুন) পানিবন্দী হয়েছে পোড়ার চরের ৪০টি পরিবার। পানিবন্দি এসব পরিবারের অনেকেই মাচা কিংবা চৌকি উঁচু করে রাত যাপন করছেন। এসব এলাকার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যমে পরিনত হয়েছে নৌকা কিংবা কলা গাছের ভেলা।

সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, আমার ইউনিয়নের দুটি গ্রামে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পরেছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি যে হারে বাড়ছে, এভাবে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকলে অনান্য এলাকা প্লাবিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আশরাফুল আলম বলেন, রৌমারীতে চলমান বন্যায় দূর্যোগ কবলিত এলাকা গুলোর মানুষের জন্য ৩ লাখ টাকার গো খাদ্য ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এবং তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবোর) নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কুড়িগ্রামে আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে বন্যা হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। তবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এখনও সবগুলো নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।