রংপুর বিভাগে চলছে বোরো মৌসুমের ধান কাটার উৎসব

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, মে ১১, ২০২২

আব্দুল্লাহ আল আমিন।।
রংপুর বিভাগের সকল জেলায় বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান ঘরে তোলা নিয়ে চারদিকে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। বাতাসে বৈইছে পাকা ধানের মধুর গন্ধ। ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই কাস্তে হাতে মাঠে নামছে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলার কৃষকরা। সোনালি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এবার বোরো মৌসুমে ৫ লাখ ৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমির লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ ফলন পাওয়ার আশা করছেন তারা। এবার প্রতি বিঘায় মোটা ধানের ফলন হতে পারে ২৮ থেকে ৩০ মণ। চিকন ধানের ফলন ২৫ থেকে ২৮ মণ। দাম ভালো পেলে বিগত সময়ের লোকসান কাটিয়ে ওঠা যাবে। পীরগাছার কৃষক আখতার হোসেন জানান, এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন ও তদারকি করেছেন।
পাশাপাশি কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, ভরা মৌসুমে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দর কমায়। বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। তাই বাজারে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি ফলন ও উৎপাদন খরচ হিসাব করে সরকারি দর বেঁধে দেয়ার দাবিও জানান তারা।

এ ব্যপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়, রংপুর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরোর লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে- ৫ লাখ ৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে রংপুরে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৪৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর এবং নীলফামারী জেলায় ৮১ হাজার ৫৫০ হেক্টর। ইতোমধ্যে গত ৮মে/২০২২ ইং পর্যন্ত রংপুরে ১৩ হাজার ১৮ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৪০ হাজার ৩৩৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৬ হাজার ৯৬৭ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৪৭৮ হেক্টর এবং নীলফামারী জেলায় ৪০৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।

সোমবার রংপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের দেখা যায় ধান কাটতে। সকালে দেখা যায়, নগরীর চিকলী বিল এলাকার পশ্চিম নীলকন্ঠ, ধাপচিকলী ভাটা ছাড়াও খটখটিয়া, সোটাপীর, আটিয়াটারীসহ অনেক এলাকার কৃষকরা ধান কাটছেন। পরপর কয়েকদিন শিলাবৃষ্টি হওয়ায় ধান চাষিদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ কাজ করছে। ফলে ৮০% ধান পাকলেই সেই ধান দ্রুত কেটে ফেলছেন তারা। তাছাড়া অপেক্ষাকৃত নিচু জমির ধান ঝুঁকিতে থাকায় চাষিরা দ্রুত কাটার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী আগাম বোরো ধান হিসেবে ২৮, ব্রি ধান ৮৮, ৮১, ৫৮, বিনা ১০, হাইব্রিড ময়না, টিয়া, সাকিসহ অন্যান্য হাইব্রিড ধান পাকায় পুরো দমে শুরু হয়েছে কাটামারি। এবারে রংপুর জেলায় মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম বোরো ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হেক্টর জমিতে। মোট ধান চাষের প্রায় ২৫%। এবারে আগাম বোরো ধানের ফলন প্রতি হেক্টরে ৩.৭ টন হয়েছে। এই আগাম বোরো ধান আগামী ১০ দিনের মধ্যে কাটামারি শেষ হবে। আর ধান পাকতে শুরু হয়েছে ব্রি ২৯, ৮৯, ৭৪, ৮৪, ৩৪ সহ অন্যান্য জাতের ধান। এই জাতের ধান আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পুরো দমে কাটা শুরু হবে।

এদিকে আগাম বোরো ধান কাটা উৎসব শুরু হলেও এখনও ধান ক্রয় শুরু না হওয়ায় একটু বিপাকে পড়ছেন ধান চাষিরা। কেননা ধান কাটতে গিয়ে যে ব্যয় তা অনেকেই ধান বিক্রি করে পরিশোধ করে থাকেন। মাঠ পর্যায়ে অনেকে বেসরকারীভাবে আগাম ধান কিনলেও এবারে এখনও কেউ ধান কেনা শুরু করেননি। ফলে ধান কাটতে গিয়ে একধরণের সমস্যায় পড়েছেন। ঈদ পরবর্তী সময় হওয়ায় এই সমস্যাটা আরও বেশি করে দেখা দিয়েছে।
চিকলীবিল সংলগ্ন মাঠে ধান চাষ করেছেন পশ্চিম নীলকন্ঠের আব্দুল হালিম। ধানের আঁটি আইলে তুলছেন তিনি। মাথার উপর প্রখর রোদ, রোদের তাপমাত্রাও অনেক বেশি। তবে প্রখর রোদের মধ্যে আব্দুল হালিমের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। কথা বলার সময় গাল ভরা পান মুখে হেসে হেসেই বলছেন। এবারে ফলন ভালো হয়েছে। পোকামাকড়ও কম হয়েছিলো। প্রত্যেকবার বৃষ্টির কারণে পানিতে ধান ডুবে যায়। তাই সবার আগে ধান লাগিয়েছিলেন তিনি। সময় মতো ধানও পেকে গেছে। তাছাড়া ঝড়-বৃষ্টির সময় ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে কেটে নিলেন বলে জানান।

ধান চাষি আজিজার রহমান জানান, ৩ বিঘা জমিতে এবারে ধান চাষ করেছেন, ধান পেকেছে তাই কাটা ও মাড়াই শেষ করেছেন তিনি। ভালো ফলন হয়েছে। কত মণ ধান হয়েছে এখনও পরিমাপ করেননি। তবে শুকিয়ে রেখেছেন ধানের ভালো দাম উঠলে বিক্রি করবেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে দাম না পেলে লোকসান হবে। অন্যদিকে ধান কাটা শুরু হওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। দম ফেলার সময় নেই, সকাল থেকে রাত অবদি ধান কাটার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। ভালো আয়ও হচ্ছে। চারিদিকে কাজের ডাক থাকায় খুশি শ্রমিকরা।

বিনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আলী জানান রংপুর বিভাগে ১৫০টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে রোরো ধানে কৃষককে সহযোগীতা করা হয়েছে । তাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে । চলতি বছর উৎপাদন ভাল হয়েছে ।

তিস্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আহসান হাবিব জানান এ বছর তিস্তা সেচ দিয়ে রোবো আবাদে সহযোগীতা করা হয়েছে । রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট তিন জেলার ১২টি উপজেলায় তিস্তা বেষ্ঠিত এলাকায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে । তিস্তার পানি দিয়ে কৃষক স্বল্প খরচে সেচ দিতে পেরেছে । এতে সেচ খরচ কমেছে । ধান উৎপাদন ভালো হয়েছে।

রংপুর কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানান, জেলায় এবার বোরো ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম বোরো ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হেক্টর জমিতে। যা মোট ধান চাষের প্রায় ২৫%। এবারে আগাম বোরো ধানের ফলন প্রতি হেক্টরে ৩.৭ টন হয়েছে। আশানুরুপ ধান ভালো হয়েছে।