ময়মনসিংহের দৃষ্টিনন্দন সিলভার ক্যাসেল

প্রকাশিত: ২:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০২২

বদরুল আমীন।। ময়মনসিংহের প্রাচীন প্রন্ততাত্বিক নিদর্শন শশীলজ, লোহার তৈরি আলেকজান্ডার ক্যাসেল, কাঠের তৈরি গৌরীপুর লজ, মুক্তাগাছা ও রামগোপালপুরের জমিদারবাড়ির মতোই একালের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী এখন ‘সিলভার ক্যাসেল’। এটি একটি আবাসিক হোটেল হলেও আধুনি কায়নের স্বপ্নময় শিল্প-বোধ ও সৌন্দর্যের ধারণায় বদলে যাওয়া এক নতুন স্থাপত্য, যা সবার কাছে ময়মনসিংহের অন্যতম দর্শনীয় বিনোদন কেন্দ্রও বটে।

চারতলা বিশিষ্ট সিলভার ক্যাসেল ভবনের অলঙ্কারিক কারুকাজের পাশাপাশি কৃত্রিম সাজসজ্জার গার্ডেন, সুইমিংপুল, শাপলা ফুলের ফোয়ারা, পার্ক, মঞ্চ ও সুসজ্জিত তোরণ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এক একর জায়গাজুড়ে ভবনের প্রবেশ পথের দুইধারে যেমন রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া তেমনি রয়েছে নানা বাহারি ফুলের বাগান। কয়েক হাত দূরে দূরে টবে লাগানো বাহারি ফুলের গাছ, ঝাউ আর ক্যাকটাসের পাশাপাশি ঝরনার পাশে সিমেন্টের ছাতার নিচে অবসর কাটানোর সুদৃশ্য চৌকি এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শামুকের আদলে তৈরি করা বসার স্থানগুলো চোখে পড়ার মতো। বৈকালিক পরিবেশ ও সান্ধ্যকালীন আলোকসজ্জা বহুদূর থেকেই নজরকাড়ে।

আগ্রার তাজমহলের মতো পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নৈসর্গিক আবহে নির্মিত সিলভার ক্যাসেল দেশী-বিদেশী মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বর্ষায় ঘন কালো মেঘ অথবা শরৎতের সাদা মেঘের ভেলায় আচ্ছাদিত হয়ে এটি মোহনীয় রূপ ধারণ করে। নান্দনিক সিলভার ক্যাসেলে বসে প্রকৃতির নির্মল প্রশান্তির জন্য নানা বয়সের মানুষ এখানে ছুটে আসছেন। শিশুদের বিনোদনের জন্য এটি একটি উপভোগ্য স্থান। পয়লা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবসসহ আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা দিবস উপলক্ষে এখানে উপচেপড়া ভিড় হয়।

হোটেল মিলনায়তন, পার্ক ও মঞ্চে আলোচনা সভা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং পিকনিকের আয়োজন করা হয়। ভবনটির তিনদিক ইট-পাথরের প্রাচীর ঘেরা হলেও ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে একদিকে তারের ভেড়া রয়েছে। যাতে নদের সৌদর্য উপভোগ করা যায়। নৌ ভ্রমণের জন্য রয়েছে স্পিডবোট ও দেশীয় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। পর্যটক ও আগন্তুকদের আড্ডার জন্য প্রবেশ পথের এক পাশে খোলা মাঠের এক কোণে ফাস্টফুড ও কফিহাউজ রয়েছে।

এখানে পারিবারিক পরিবেশ থাকার পরিবেশও বিদ্যমান। নবদম্পতিদের জন্য রয়েছে ‘হানিমুন কটেজ’। সুসজ্জিত রান্নাঘর ও দক্ষ পাচকও রয়েছে। এখানে নবদম্পতিরা টানা কয়েক দিন বসবাস করতে পারেন। ভবনের সামনের মাঠে প্যান্ডেল তৈরি করে নানা সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পুনর্মিলনী ও মিলনমেলার আয়োজন করে। শহরতলীর এক পাশে সিলভার ক্যাসেল অবস্থিত হওয়ায় এখানে যানজট নেই। এর মাঠে আড্ডা দেয়া যায়। দূর্বাঘাসের ওপর বসে খাওয়াও যায়। প্রতিদিনই এখানে নানা বয়সের মানুষ বেড়াতে আসেন।

বলাবাহুল্য এটির নির্মাতা কোনো স্থাপত্যবিদ নন। যার শিল্প-বোধ, আঞ্চলিক আবহাওয়া ও পরিবেশের পরিপূর্ণ ধারণায় সিলভার ক্যাসেল নির্মিত হয়েছে তিনিই এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক বেগ। তার মৃত্যুতে তার ছেলে জানান, ১৯৫০ সালে পাঁচ একর জমিতে চামড়ার ফ্যাক্টরি ‘ময়মনসিংহ ট্যানারি স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতার পর ট্যানারি ব্যবসায় লোকসানের মুখে পড়লে ১৯৭৮ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন জায়গাটি পরিত্যক্ত ছিল। কিছু জমি হাউজিং প্রকল্পের অধীনে ছেড়ে দেয়া হয়। এখানে ‘রিভার প্যালেস’ নামে একটি আবাসিক হোটেল নির্মিত হওয়ার পর দেশী-বিদেশী অতিথিদের আগমন শুরু হয়।

তিনি আরো জানান, আমার বাবা ছেলেবেলা থেকেই দৃষ্টিনন্দন একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখতেন তিনি কিন্তু সময় ও অর্থের অভাবে তা নির্মাণে বিলম্বিত হয়। ময়মনসিংহ শহরের এই পৈতৃকভিটায় একটি ছোট্ট বাগান বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় পারিবারিকভাবেই। ২০০৮ সালে প্রত্যাশিত সেই ছোট্ট বাড়ির চারতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। তিনিই নামকরণ করেন ‘সিলভার ক্যাসেল’। ভবনটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর নির্মাণ দেখে অনেকেই ভবনটিকে আবাসিক হোটেলে পরিণত করতে উৎসাহিত করেন। সেই চিন্তা থেকেই সিলভার ক্যাসেলকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দৃষ্টিনন্দন আবাসিক হোটেলে রূপান্তর করা হয়।

এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক চিন্তা না করে আবাসিক হোটেলকেই একটি বিনোদন কেন্দ্র বা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হয়, যা এখন দেশীয় অনেক পাঁচতারা হোটেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এখানে ২২টি কক্ষ, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তন, একটি রেস্তÍরাঁ, বারবিকিউ, সুইমিংপুল, তিনটি ফোয়ারা, দু’টি পৃথক সিঁড়ি ও একটি লিফট এবং সুসজ্জিত বিনোদন পার্ক রয়েছে। শিশুদের জন্য খেলাধুলার আয়োজনও রয়েছে। এখানে দেশী-বিদেশী মেহমান বা বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিরাই বেশি থাকেন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ে একটি সম্মেলন এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিলভার ক্যাসেলকে ময়মনসিংহ মহানগরের অবকাঠামোগত সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে আখ্যা দিয়ে ময়মনসিংহ ট্যুরিজম কাবের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শরীফউদ্দিন বলেন, এটা শৈল্পিক দিক থেকে মহানগরকে সমৃদ্ধ করেছে। এখান থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের নৈসর্গিক দৃশ্য সবাইকে বিমোহিত করে। এটা হোটেল হলেও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকায় এটাকে কটেজ বা রিসোর্টও বলা যায়। এখানকার বিনোদন ব্যবস্থা সব বয়সের মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অথবা ক্যাপসুল লিফটে ওঠা-নামার সময় বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র নদের জলরাশি বা উত্তাল-পাতাল ঢেউ আবার শুকনো মওসুমের চিকমিক বালুচর চমৎকার দেখায়। এমন দৃশ্য খুব কমই চোখে পড়ে। বিদেশীদের কাছেও এটা আকর্ষণীয়।