কুড়িগ্রামে ২৪হাজারে ১জন চিকিৎসক এবং সাত হাজারে ১জন নার্স

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২১

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি।।দেশের বৃহৎ নদ-নদীময় ও সীমান্তবর্তি এবং দারিদ্রতম উত্তরের সর্বশেষ জেলা কুড়িগ্রামে প্রায় ২৪হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক এবং সাত হাজার মানুষের জন্য একজন নার্স রয়েছে। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতায় পিছিয়ে থাকা কুড়িগ্রাম জেলার চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব বেশি। ফলে জেলার স্বাস্থ্যসেবার ভংগুর দশা। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক কম এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা পাওয়া ভার। জেলার সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর, ঢাকা এবং বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক গুলোতে ছুটতে হয়। এতে করে দারিদ্রপীড়িত এই জনপদের সময় এবং অর্থ দুটোই ব্যয় হওয়ায় আরও পিছিয়ে পড়ছে।

জেলা সিভিল সার্জন সূত্রে জানাযায়, কুড়িগ্রামে ২০১টি চিকিৎসক পদে আছে ৯৫জন। শূন্য ১০৬টি পদ। নার্সের ৩৮১টি পদের মধ্যে আছে ৩৩২জন। এদের মধ্যে ৮জন চিকিৎসক ডেপুটেশনে জেনারেল হাসপাতাল এবং জেলার বাইরে রয়েছেন। জেলায় একটি ২৫০ শয্যা, এবং ৩১শয্যা হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়াও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮জন চিকিৎসকের বিপরীতে আছে ৭জন।

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৪২টি চিকিৎসক পদে আছে ১৭জন, নার্স-১৬৬টি পদের মধ্যে আছে ১৫১জন। নাগেশ^রীতে চিকিৎসক ১৮জনের মধ্যে ৮জন,নার্স-৩৩টির মধ্যে ৩০জন। ভূরুঙ্গামারীতে চিকিৎসক-১৯টির মধ্যে- ১১জন, নার্স ২৭টির মধ্যে-২৪জন। ফুলবাড়িতে চিকিৎসক-১৬জনের মধ্যে ৮জন, নার্স-২৫টির মধ্যে-২০জন। রাজারহাটে চিকিৎসক-১৫জনের মধ্যে ৯জন, নার্স-২৬টির মধ্যে-২২জন। উলিপুরে-২৭টির মধ্যে-১৩জন, চিলমারীতে চিকিৎসক-২৬টির মধ্যে ৯জন। এই দুটি উপজেলার ২৬টি নার্সের মধ্যে আছে ২৬জন। রৌমারীতে চিকিৎসক-১৪জনের মধ্যে ৭জন, নার্স-২৭টির মধ্যে ১৫জন। এবং রাজিবপুরে চিকিৎসক-১১জনের মধ্যে- ৩জন, নার্স-২৩টির মধ্যে ১৭জন রয়েছেন। এসব চিকিৎসকদের মধ্যে কনসালটেন্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই বললে চলে।

এতে করে দেখাযায় জেলার প্রায় ২২লাখ জনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ২৪হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক এবং সাত হাজার মানুষের জন্য একজন নার্স সেবাদানে রয়েছেন।

এমন চিকিৎসক সংকট এবং দূরাবস্থায় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহি: র্বিভাগে প্রতিদিন শত-শত মানুষ চিকিৎসা নেন। নিয়মিত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন বরাদ্দকৃত শয্যার চেয়ে বেশি রোগি। চিকিৎসক সংকটে এসব চিকিৎসা প্রত্যাশিদের সঠিক চিকিৎসা পাওয়াই দূরহ হয়ে পড়েছে হাসপাতাল গুলোতে। রোগির চাপ সামলাতে বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পদায়নকৃত চিকিৎসক এবং ইউনিয়ন সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সংযুক্তি করণ করে জোড়াতালি দিয়ে চলছে জেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা।

 

শুধু চিকিৎসক সংকট নয় আছে টেকনোলজিষ্ট এবং জনবলেরও। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামাদী না থাকায় রোগিদের বিভিন্ন টেষ্ট বাইরে করতে হয়। চিকিৎসক সংকট থাকায় কাংখিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ সাধারণ মানুষের।

চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ঠকের হাট ফইল মারী গ্রামের বাসিন্দা নজির হোসেন বলেন, হাঁপানি,হাড়ের সমস্যা, ডায়াবেটিস রোগে ভুগবার নাগ ছং বাহে মেলা দিন থাকি। হাসপাতালে ভর্তি আছং সাত/আট হইল। সারাদিনে ডাক্তার খালি একবার আইসে। হাসপাতালত যে খাবার সেগলা খাওন যায়না। বাশি উটি(রুটি) পচাশরা কলা। তরকারি-ভাত দেয় মুখত দেওয়া যায় না। অনেক উগি না খায়া বাইরা কুকুর- বিড়ালক দেয়। কাউও ঠেকাত পরিয়া খায়। হামরা গরীব মানুষ চিকিৎসা নিবার আসি। ওমার সাথে কাইজা(ঝগড়া) করবার তো আসি না।

সদরের পৌর এলাকার ভেলাকোপা গ্রামের বাসিন্দা সেকেন্দার আলী বলেন, ক’দিন থাকি গায়ত জ্বর। প্যাটের মধ্যে গ্যাসের ব্যথাও আছে। টেকা খরচ করি হাসপাতাল আসি ওষুধ পাই না। ডাক্তারও ঠিক মতো বইসে না। হামার গরিব মাইনষের অসুখ হইলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নাই।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চাঁকেন্দা খান পাড়ার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক সরকারি হাসপাতালে গেইলে ডাক্তারও নাই ওষুধও নাই। হামার চর থাকি টাকা খরচ করি যায়া ডাক্তার পাই না। এজন্যে হামরা গ্রাম্য ডাক্তারের টাই চিকিৎসা নেই। হামাগো চরের মাইনষের কষ্ট কাউও বুঝবার চায় না। একটা/দুইটা ডাক্তার উগি(রোগী) দেখে ভীড়ও অনেক।

এই বিষয়ে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাড: আহসান হাবীব নীলু বলেন, পিছিয়ে পড়া উত্তরের জনগোষ্ঠির জন্য হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হলেও সেই তুলনায় চিকিৎসকসহ জনবল বাড়েনি। করোনার প্রাদুর্ভাব সৃষ্টির পর থেকে কিছু চিকিৎসকের রোগি দেখা কমিয়ে দেবার কারণেও অন্যান্য রোগিরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে এই জনপদের মানুষ সঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেনা। দারিদ্রপীড়িত এই জনপদের জন্য চিকিৎসক, জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি হাসপাতাল গুলোকে আধুনিকায়ন করলে চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডাঃ হাবিবুর রহমান সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, নার্স সংকট তুলনা মূলক রয়েছে। হাসপাতাল গুলোতে রোগির চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের বেগ পেতে হয়। চিকিৎসক বৃদ্ধি এবং জনবল বাড়ানোর কাজ প্রক্রিয়াধীণ রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে সমস্যার সমাধান কমে আসবে।